মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) ইরান যুদ্ধ কাটায় কাটায় দুই মাস অতিক্রম করল। বিবিসি, এএফপি, আল জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এ নিয়ে নানা বিশ্লেষণী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গত দুই মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধের (যাকে ইরানিরা রামাদান যুদ্ধ বলছে) ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক কাঠামোর বিবর্তন নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ উপস্থাপন করছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মধ্য দিয়ে যে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, আজ তার ৬০তম দিন। এই দুই মাসে তেহরানের আকাশ থেকে শুরু করে সাধারণ ইরানিদের রান্নাঘর পর্যন্ত অনেক কিছুই পাল্টে গেছে।
যুদ্ধের শুরুতেই সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে ইরানের রাজনৈতিক হৃদপিণ্ডে। মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। ওয়াশিংটন এটিকে রেজিম চেঞ্জ বা শাসন পরিবর্তনের শুরু বলে দাবি করলেও বাস্তবে চিত্রটি ভিন্ন। ইরানিরা আরো ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, শাসন বা শাসকেরও কোনো বদল ঘটেনি।
তবে দেশটিতে কয়েক দশকের স্থিতিশীল নেতৃত্ব হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে। খামেনির পাশাপাশি সাবেক স্পিকার আলী লারিজানি এবং নৌবাহিনী প্রধান আলী রেজা তাংসিরিসহ শীর্ষপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। বলা যায়, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেসকিয়ান ছাড়া শীর্ষ পর্যায়ের সব কর্মকর্তাকেই হত্যা করেছে মার্কিন-ইসরায়েলিরা।
এতকিছুর পরও বদলায়নি ইরানের শাসনব্যবস্থা। ধসে পড়েনি প্রশাসন। বরং খুব দ্রুততার সাথে আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। যদিও তাকে জনসমক্ষে দেখা যাচ্ছে না, তবে বিচার বিভাগ, সামরিক বাহিনী এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ, ব্যবস্থার কাঠামোটি অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।
সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রায় প্রভাব ফেলেছে চাপিয়ে দেওয়া এই যুদ্ধ। অনেকের চাকরি হারানো ও অভাবের মিছিল বড় হয়েছে। ৯০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের দেশ ইরানে যুদ্ধের প্রভাব এখন প্রতিটি ঘরে ঘরে স্পষ্ট।
যুদ্ধের কারণে দেশটির অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে বেকারত্ব আকাশচুম্বী। খাদ্যদ্রব্য ও নিত্যপণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গত দুই মাসে ইরান প্রায় ৩০০ বিলিয়ন থেকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
চরম দুর্ভোগ সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশকে রাষ্ট্রীয় প্রচারণার প্রভাবে জাতীয়তাবাদী আবেগে উদ্বুদ্ধ দেখা যাচ্ছে এখনো। তবে পর্দার আড়ালে অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে ক্ষোভও দানা বাঁধছে।
ইরান এই যুদ্ধে তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়াকে।
যুদ্ধে ইরানের প্রায় ছয় হাজার সামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন ও ১৯০টির বেশি ব্যালিস্টিক মিসাইল লঞ্চার ধ্বংস হয়েছে। তাদের নৌবাহিনীর বড় একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সামরিক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে বন্ধ রাখতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা চললেও ইরান শর্ত দিয়েছে, মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার না করলে তারা বিশ্ব বাণিজ্যের এই লাইফলাইন খুলে দেবে না।
ইরানের অক্ষশক্তি বা প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো এই যুদ্ধে বড় ধরণের চাপের মুখে পড়েছে। শীর্ষ সহযোদ্ধা গ্রুপ হিজবুল্লাহ ও হামাস লেবানন থেকে লড়াই করছে। তাদের ওপর ইসরায়েলি হামলায় হিযবুল্লাহর এক হাজার ৭০০-এর বেশি যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। হিজবুল্লাহ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এখনো পুরোপুরি তারা নির্মূল হয়নি এবং তারা এখনো বিপুল বিক্রমে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে ইরান এখন আগের চেয়েও অনেক বেশি একা। আরব দেশগুলোর ওপর ইরানের পাল্টা হামলার কারণে প্রতিবেশীদের সাথে তেহরানের দূরত্ব বেড়েছে। তবে রাশিয়া ও চীন পর্দার আড়াল থেকে ইরানকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।
গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা কমেনি। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর কাউন্টার-ব্লকেড বা পাল্টা অবরোধ আরোপ করেছে।
দুই মাসের এই যুদ্ধ ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিলেও দেশটির শাসকগোষ্ঠী এখনো ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে ইরান এখন এক নতুন এবং সম্ভবত আরও বেশি রক্ষণশীল যুগে প্রবেশ করছে। ইরানিদের মধ্যে যে কিছুটা বিভক্তি ছিল, এই যুদ্ধ সেই ক্ষত সারিয়ে ঐক্যবদ্ধ করে দিয়েছে।
এই যুদ্ধটি শেষ অবধি মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দেবে কি না, তা এখন নির্ভর করছে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান আলোচনার সফলতার ওপর।
সূত্র: বিবিসি, এএফপি, আলজাজিরা