ওমান উপসাগর থেকে ইরানের পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ জব্দ ঘিরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সোমবার নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। জাহাজ জব্দের ঘটনাকে ‘সশস্ত্র জলদস্যুতা’ ও ‘যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন’ বর্ণনা করে পাল্টা জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছে তেহরান। এটি এমন একটি সময় ঘটল, যখন যুদ্ধ বন্ধে দুই দেশকে দ্বিতীয় দফায় আলোচনার টেবিলে বসানোর চেষ্টা করছে মধ্যস্থাকারী দেশ পাকিস্তান।
ইরান যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে দ্বিতীয় দফায় আলোচনা শুরু করতে আবার পাকিস্তানে যাচ্ছে মার্কিন প্রতিনিধিদল। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে তারা সোমবার সন্ধ্যায় ইসলামাবাদে পৌঁছাবেন বলে জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সেই আলোচনায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করেনি ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ তুলে না নিলে আলোচনায় অংশ নেবে না তেহরান। হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা বিবিসিকে নিশ্চিত করেছেন, গতবারের মতো এবারও মার্কিন প্রতিনিধিদলে রয়েছেন ট্রাম্পের দুই ‘গুরুত্বপূর্ণ’ উপদেষ্টা স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার।
এর মধ্যেই ইরানি পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ আটকের খবর দিল যুক্তরাষ্ট্র। এ ঘটনায় দুই পক্ষের মধ্যকার আলোচনা পুনরায় শুরুর প্রচেষ্টাটি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ট্রাম্প স্থানীয় সময় রোববার লিখেছেন, ‘আজ তৌসকা নামের প্রায় ৯০০ ফুট দীর্ঘ একটি ইরানি পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ আমাদের নৌ অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেটি তাদের জন্য ভালো হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, জাহাজটিকে থামার জন্য সতর্ক করা হয়েছিল, কিন্তু জাহাজটি তা মানেনি। ‘তাই আমাদের নৌবাহিনীর জাহাজ ইঞ্জিনরুমে গুলি চালিয়ে সেটিকে থামিয়ে দেয়।’
তিনি আরও দাবি করেন, ‘তৌসকা’ যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে এবং অতীতে অবৈধ কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত ছিল। ‘জাহাজটি এখন আমাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এবং আমরা এর ভেতরে কী আছে তা পরীক্ষা করছি।’
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড পরে একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে একটি নৌযানকে কার্গো জাহাজটি আটকাতে দেখা যায়। ভিডিওতে আরও দেখা যায়, জাহাজটির দিকে একটি বন্দুক থেকে গুলি ছোড়া হচ্ছে।
অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত এক বিবৃতিতে দেশটির সামরিক সদর দপ্তর খাতাম আল-আনবিয়ার এক মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ওমান সাগরে ইরানের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি চালিয়েছে, এর নেভিগেশন ব্যবস্থা অচল করেছে এবং মেরিন মোতায়েন করে জাহাজে উঠেছে।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনী খুব শিগগিরই মার্কিন নৌবাহিনীর এই ‘সশস্ত্র জলদস্যুতার জবাব দেবে।’
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া শর্ত মেনে ইরান ‘কখনোই’ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি হবে না বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন দেশটির জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ ইব্রাহিম আজিজি। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোরের (আইআরজিসি) সাবেক এ কমান্ডার বলেন, ‘কখনোই না…এটি আমাদের মৌলিক অধিকার। এমনকি কোন জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করবে, সেটাও ইরানই নির্ধারণ করবে।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে সংঘাত শুরু হয় এবং পাঁচ সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে হামলা চলার পর দুই সপ্তাহের জন্য একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। এই মাসের শুরুর দিকে প্রথম দফা আলোচনা হয় এবং কোনো সমঝোতা ছাড়াই তা শেষ হয়। এরপর ডোনাল্ড ট্রাম্প নৌ অবরোধের ঘোষণা দেন। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত রয়েছে।
আবারও বাড়তে শুরু করেছে তেলের দাম
অন্যদিকে মার্কিন নৌবাহিনীর হাতে ইরানের পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ আটকের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর বিশ্ববাজারে আবারও বাড়তে শুরু করেছে জ্বালানি তেলের দাম। ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ইতোমধ্যে ৪.৭৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৯৪.৬৬ মার্কিন ডলারে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মূল্যও ৫.৬ শতাংশ বেড়ে ৮৮.৫৫ ডলারে পৌঁছেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। তার পর থেকেই জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে ওঠানামা করতে দেখা যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ করা হয়ে থাকে। যুদ্ধের কারণে সেটি রীতিমত বন্ধ হয়ে গেছে।