বিবিসির অনুসন্ধান
যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতি পেতে হাজার হাজার পাউন্ডের বিনিময়ে অভিবাসীদের সমকামী সাজতে সাহায্য করছে একদল অসাধু আইনি প্রতিষ্ঠান ও পরামর্শদাতা। বিবিসির এক বিশেষ অনুসন্ধানে এই জালিয়াতির তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) প্রকাশিত এই অনুসন্ধানের প্রথম পর্বে দেখানো হয়েছে, যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে, সেসব অভিবাসীদের কীভাবে ভুয়া জীবনবৃত্তান্ত তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে তাদের শেখানো হচ্ছে, কীভাবে বানোয়াট সমর্থনসূচক চিঠি, ছবি ও মেডিকেল রিপোর্ট সংগ্রহ করতে হয়। এরপর তারা নিজেদের ‘সমকামী’ দাবি করে এই বলে আশ্রয়ের আবেদন করে যে, পাকিস্তান বা বাংলাদেশে ফিরে গেলে তাদের জীবন বিপন্ন হতে পারে।
বিবিসির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘যারা এই ব্যবস্থাকে অপব্যবহার করার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে দেশের আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তাদের দেশ থেকেও বের করে দেওয়া হতে পারে।’
যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক আশ্রয় ব্যবস্থা মূলত তাদের সুরক্ষা দেয়, যারা নিজ দেশে ফিরলে বিপদের মুখে পড়তে পারেন। যেমন পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো দেশ, যেখানে সমকামিতা অবৈধ।
তবে বিবিসির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অভিবাসীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়ে আইনি পরামর্শদাতারা পরিকল্পিতভাবে এই ব্যবস্থার অপব্যবহার করছেন।
এই অভিবাসীদের বেশির ভাগই স্টুডেন্ট, ওয়ার্ক বা ট্যুরিস্ট ভিসায় যুক্তরাজ্যে এসে মেয়াদ শেষ করে ফেলেছেন। এরা সেই দলভুক্ত নয়, যারা ছোট নৌকায় বা অবৈধ পথে দেশটিতে ঢুকেছে।
এই ধরনের আবেদনকারী এখন মোট রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের ৩৫ শতাংশ; যা ২০২৫ সালে ১ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
প্রাথমিক তথ্য ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিবাসন পরামর্শদাতাদের তৎপরতা যাচাই করতে ছদ্মবেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিক পাঠায় বিবিসি। ওই সাংবাদিকেরা পাকিস্তান ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সেজেছিলেন, যাদের ভিসার মেয়াদ প্রায় শেষ পর্যায়ে।
অনুসন্ধানে যা পাওয়া যায়—
> একটি আইন সংস্থা একটি ভুয়া আশ্রয়ের আবেদন দাখিল করতে ৭ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত ফি দাবি করেছে এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আবেদন বাতিলের সম্ভাবনা খুবই কম।
> ভুয়া আশ্রয়প্রার্থীরা মেডিকেল প্রমাণ জোগাড় করতে এবং নিজেদের মামলা শক্তিশালী করতে জিপি (জেনারেল প্র্যাকটিশনার) বা চিকিৎসকের কাছে গিয়ে বিষণ্নতার নাটক করেছেন। এমনকি একজন নিজেকে ‘এইচআইভি পজিটিভ’-ও দাবি করেন।
> একজন অভিবাসন পরামর্শদাতা গর্ব করে বলেছেন, তিনি গত ১৭ বছর ধরে এ ধরনের ভুয়া আবেদন তৈরিতে সাহায্য করছেন। তিনি জানান, মক্কেলের সমকামী সম্পর্কের দাবি সত্য প্রমাণ করতে তিনি অন্য কাউকে ভুয়া পার্টনার বা সঙ্গী হিসেবেও হাজির করান।
> বিবিসির ছদ্মবেশী সাংবাদিককে এমনও বলা হয়, তিনি যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়ে গেলে তার স্ত্রীকে পাকিস্তান থেকে নিয়ে আসতে পারবেন এবং তার স্ত্রীও তখন নিজেকে ‘সমকামী’ দাবি করে ভুয়া আবেদন করতে পারবেন।
> অন্য একটি ফার্মের সঙ্গে যুক্ত এক আইনজীবী বিবিসির সাংবাদিককে জানান, তিনি অভিবাসীদের সমকামী বা নাস্তিক সাজিয়ে সফলভাবে রাজনৈতিক আশ্রয় পেতে সাহায্য করেছেন। তিনি দেড় হাজার পাউন্ড ফি-এর বিনিময়ে ভুয়া আবেদন তৈরিতে সহায়তার প্রস্তাব দেন এবং বানোয়াট প্রমাণ তৈরির জন্য আরও ২ থেকে ৩ হাজার পাউন্ড খরচ হবে বলে জানান।