২০০৩ সালের ১৯ মার্চ। মার্কিন বাহিনী ইরাকের সীমান্ত অতিক্রম করছে। সেসময় হোয়াইট হাউস থেকে বিশ্ববাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ।
তিনি বলেন, ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র দিয়ে শান্তি নষ্টকারী কোনো বেআইনি শাসকের দয়ার ওপর আমেরিকা ও আমাদের মিত্ররা বেঁচে থাকবে না। আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য সেই স্বাধীনতা রেখে যাব, যা আমরা আজ ভোগ করছি—যার মধ্যে প্রধান হলো ভয় থেকে মুক্তি।’
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাগদাদের পতন ঘটে। সাদ্দাম হোসেনের মূর্তি ভেঙে ফেলার দৃশ্য বিশ্বজুড়ে ‘মুক্তির প্রতীক’ হিসেবে প্রচার করা হয়।
কিন্তু সেই বছরের শেষ নাগাদ ইরাক ভয়াবহ বিদ্রোহ ও গৃহযুদ্ধের কবলে পড়ে।
গত কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটনের প্রধান বিদেশি সামরিক অভিযানগুলোর নেপথ্যে ছিল ‘মুক্তির’ বুলি—‘একনায়কতন্ত্রের অবসান’, ‘সন্ত্রাসবাদ নির্মূল’ কিংবা ‘দমন-পীড়ন থেকে মুক্তি’—অজুহাত যেন ফুরাবার নয়।
বাগদাদ থেকে কাবুল—মার্কিন নেতারা বারবার গণতন্ত্র, নারী অধিকার এবং মানবিক মর্যাদার কথা বলেছেন। অথচ অন্যান্য সংঘাতের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ফিলিস্তিনে ওয়াশিংটনের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে তারা কোনো ‘মুক্তির বুলি’ না আউড়ে কৌশলগত মিত্রতা বা সীমিত সামরিক সম্পৃক্ততার ওপর নির্ভর করে।
সমালোচকেরা এই ধারাকে বলছেন ‘পছন্দমাফিক মুক্তি’। অর্থাৎ, যখন মানবাধিকারের ভাষা মার্কিন কৌশলগত স্বার্থের পক্ষে যায়, তখন তা ব্যবহার করা হয়। যখন স্বার্থের পরিপন্থী হয়, তখন তা কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়।
এই ‘পছন্দমাফিক মুক্তি’ ফের সামনে আসে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করে, ওই হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন।
আধুনিক ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে বিদেশি বাহিনীর হাতে কোনো বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু নজিরবিহীন এবং এটি তৎক্ষণাৎ বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
পশ্চিম ও দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। করাচি, বাগদাদ ও তেহরানে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হন। এমনকি ওয়াশিংটন ও নিউইয়র্কেও যুদ্ধবিরোধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
ওয়াশিংটনের এক বিক্ষোভকারী দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘আমরা এই চিত্রনাট্য আগেও দেখেছি। সরকার পরিবর্তন কোনো সংঘাত শেষ করে না, বরং নতুন সংঘাতের জন্ম দেয়।’
এই অভিযানের পেছনে মার্কিন যুক্তি—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ।
তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল গ্রোসি সেই দাবিকে কিছুটা জটিল করে তুলেছেন।
তিনি বলেছেন, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও পরিদর্শকেরা ইরান সক্রিয়ভাবে পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে—এমন কোনো প্রমাণ পাননি।
ইরানি রেড ক্রিসেন্টের তথ্যমতে, ইরান যুদ্ধে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৩৩২ জন নিহত হয়েছেন।
ইরানের মিনাব শহরে এক স্কুলে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৬৮ জন শিশু ও ৭ জন শিক্ষক প্রাণ হারিয়েছেন। ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী।
এই ঘটনা বিশ্লেষকদের মধ্যে পুরনো বিতর্ককে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে—যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে তাদের সামরিক হস্তক্ষেপের ব্যাখ্যা দেয়?
পশ্চিম এশিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ কূটনীতিক তালমিজ আহমদ বলেন,“যুক্তরাষ্ট্র সবসময় ক্ষমতা দখলের রাজনীতিকে জায়েজ করতে উচ্চাভিলাষী আদর্শের ওপর নির্ভর করে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় তাদের বুলি ছিল, ‘স্বৈরাচারী’ কমিউনিজমের হাত থেকে ‘মুক্ত বিশ্ব’-কে রক্ষা করা। আজ তা হলো ‘স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের লড়াই’। ভাষা বদলায়, কিন্তু ক্ষমতার যুক্তি একই থাকে।”
আহমদের মতে, বুলির সঙ্গে বাস্তবতার এই ব্যবধান কয়েক দশক ধরে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য।
তিনি বলেন, ‘আপনি যদি ঐতিহাসিকভাবে দেখেন, খুব কম দেশই মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে সরাসরি স্থিতিশীল গণতন্ত্রে পরিণত হতে পেরেছে।’
ইরাক আক্রমণ ‘মুক্তির বুলির’ সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার সংঘাতের সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
১৯৯৮ সালে মার্কিন কংগ্রেস ‘ইরাক লিবারেশন অ্যাক্ট’ পাস করে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছিল, সাদ্দাম হোসেনকে হটানো এবং ইরাকে গণতন্ত্রের প্রসারই আমেরিকার সরকারি নীতি।
১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর বুশ প্রশাসন এই ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তনকে একই সঙ্গে কৌশলগত প্রয়োজন এবং নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরে।
বুশ বারবার এই যুদ্ধকে ইরাকিদের ‘একনায়কতন্ত্র থেকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তিনি বলেছিলেন, ‘ইরাকি জনগণ স্বায়ত্তশাসনের যোগ্য ও সক্ষম।’
অথচ আক্রমণের অন্যতম প্রধান অজুহাত সেই ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্রের’ কোনো অস্তিত্ব কখনো পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির কস্টস অব ওয়ার প্রজেক্টের তথ্যমতে, ২০০৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ইরাকে প্রায় ২ লাখ ৬৮ হাজার থেকে ২ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি বেসামরিক নাগরিক।
সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ইরাকি সমাজকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পতন ইসলামিক স্টেট (আইএস) উত্থানের পথ প্রশস্ত করে।
২০০৪ সালে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে এক ইরাকি সরকারি কর্মচারী বলেছিলেন, ‘আমরা স্বাধীনতা চেয়েছিলাম, বিশৃঙ্খলা নয়।’
এটিই ছিল পরবর্তী সময়ে অনেক ইরাকিদের মূল অনুভূতি।
এর দুই বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র ‘মুক্তির’ ভাষায় আরেকটি যুদ্ধ শুরু করেছিল।
১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর আল-কায়েদাকে নির্মূল করতে এবং তাদের আশ্রয়দাতা তালেবান সরকারকে হটাতে আফগানিস্তানে হামলা চালায় ওয়াশিংটন।
শুরুতে এই হস্তক্ষেপ ব্যাপক আন্তর্জাতিক সমর্থন পেয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ যখন দুই দশকের ‘জাতি গঠন’ প্রকল্পে রূপ নিল, তখন মার্কিন বুলিতে গণতন্ত্র ও নারী অধিকারের ওপর জোর দেওয়া হতে থাকল।
২০০১ সালে এক রেডিও ভাষণে ফার্স্ট লেডি লরা বুশ ঘোষণা করেছিলেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই একই সঙ্গে ‘নারীদের অধিকার ও মর্যাদার লড়াই’।
মেয়েরা স্কুলে ফিরল। পুনর্গঠন প্রকল্পে কোটি কোটি ডলারের সাহায্য এল এবং নতুন সংবিধানের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।
তবুও তালেবানরা কখনোই পুরোপুরি পরাজিত হয়নি। ২০২১ সালে যখন মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হলো, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আফগান সরকারের পতন ঘটল এবং তালেবানরা ক্ষমতায় ফিরল।
একজন আফগান নারী অধিকারকর্মী পরে বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘তারা আমাদের মুক্ত করার কথা বলেছিল। কিন্তু নিরাপত্তা ছাড়া মুক্তি কেবল সাময়িক।’
ইতিহাসবিদ এবং ট্রাইকন্টিনেন্টাল ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল রিসার্চের পরিচালক বিজয় প্রসাদ মনে করেন, এই ধরনটি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির গভীরে গেঁথে আছে।
তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র কখনোই মানবাধিকার বা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তাদের উদ্বেগের বিষয়ে আন্তরিক নয়। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর থেকেই তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটানো।’
বিজয় প্রসাদের মতে, ইরান নিয়ে ওয়াশিংটনের বর্তমান বুলিগুলো আসলে তাদের পুরনো সামরিক হস্তক্ষেপের বুলিগুলোরই প্রতিধ্বনি।
মৃণালিনী ধ্যানী আউটলুক ইন্ডিয়ার জ্যেষ্ঠ সংবাদদাতা
আউটলুক ইন্ডিয়া থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত