বিশ্বকাপ ফাইনাল মানেই শুধু ৯০ মিনিটের লড়াই নয়। মাঠে বল গড়ানোর আগেই আলোচনায় উঠে আসে নানা পরিসংখ্যান, পুরোনো ইতিহাস, কুসংস্কার আর অদ্ভুত সব মিল কিংবা অমিল। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। নিউজার্সিতে বিশ্বকাপের মেগা ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দুই দল স্পেন ও আর্জেন্টিনা। শিরোপা জিততে মাঠে নামার আগে দুই দলকে ঘিরে রয়েছে একের পর এক চমকপ্রদ তথ্য।
ফাইনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন স্লোভেনিয়ার স্লাভকো ভিনচিচ। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম স্লোভেনীয় হিসেবে ফাইনাল পরিচালনা করতে যাচ্ছেন তিনি। তবে এই রেফারির স্মৃতি দুই দলের জন্যই ভিন্ন। ২০২৪ সালের ইউরো সেমিফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে ফ্রান্সকে হারানোর ম্যাচ পরিচালনা করেছিলেন ভিনচিচ। আবার ২০২২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক হারের ম্যাচেও তিনিই ছিলেন রেফারি।
চলতি টুর্নামেন্টে কড়া রেফারিংয়ের জন্যও আলোচনায় ছিলেন ভিনচিচ। গড়ে প্রতি ম্যাচে ২.৩৩টি হলুদ কার্ড দেখিয়েছেন তিনি। মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচে মুখে হাত দিয়ে কথা বলায় একুয়াদরের পিয়েরো হিনকাপিয়েকে লাল কার্ড দেখানোর ঘটনাও রয়েছে তার পরিচালিত ম্যাচে।
পরিসংখ্যান বলছে, ফাইনালের আগে কিছুটা এগিয়ে স্পেন। গত ১৪টি বিশ্বকাপ ও ইউরো ফাইনালের (পুরুষ ও নারী উভয় বিভাগ) মধ্যে ১৩ বারই শিরোপা জিতেছে সেই দল, যারা সেমিফাইনাল আগে খেলেছিল। এবারও স্পেন আর্জেন্টিনার চেয়ে একদিন বেশি বিশ্রাম পেয়েছে।
শুধু বিশ্রামই নয়, মাঠে কাটানো সময়েও এগিয়ে স্প্যানিশরা। নকআউট পর্বের সব ম্যাচ নির্ধারিত ৯০ মিনিটেই শেষ করেছে তারা। অন্যদিকে আর্জেন্টিনাকে দুবার অতিরিক্ত সময় খেলতে হয়েছে। ফলে পুরো টুর্নামেন্টে লিওনেল মেসিদের মাঠে থাকতে হয়েছে ৭৯৪ মিনিট, যেখানে স্পেন খেলেছে ৭১৭ মিনিট। যদিও কাতার বিশ্বকাপেও অতিরিক্ত সময় খেলেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আর্জেন্টিনা, তবে চার বছরের বুড়িয়ে যাওয়া দলটির জন্য এবার সেই ধকল সামলানো বড় চ্যালেঞ্জ।
আর্জেন্টাইনদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে আরেকটি পুরোনো বিশ্বাসও। টানা ৩৬ বছর ধরে দেশটির কোনো প্রেসিডেন্ট মাঠে গিয়ে জাতীয় দলের বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখেন না। ১৯৯০ বিশ্বকাপে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট কার্লোস মেনেম গ্যালারিতে উপস্থিত থাকার পর ক্যামেরুনের কাছে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। এরপর থেকেই এটি দেশটিতে এক ধরনের কুসংস্কারে পরিণত হয়েছে।
বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইও সেই ধারা বজায় রেখেছেন। তিনি আগেই জানিয়েছেন, নিউ জার্সিতে যাচ্ছেন না; বুয়েনস আইরেসের বাসভবন থেকেই ফাইনাল দেখবেন। অন্যদিকে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এবং রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ গ্যালারিতে উপস্থিত থেকে দলকে সমর্থন জানাবেন।
ফুটবলীয় কৌশলের দিক থেকেও ফাইনালটি হতে যাচ্ছে দুই ভিন্ন দর্শনের লড়াই। পুরো টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ১৯ গোল করেছে আর্জেন্টিনা। বিপরীতে স্পেন মাত্র ১ গোল হজম করে গড়েছে সবচেয়ে শক্ত রক্ষণভাগের রেকর্ড।
আরও একটি মিল রয়েছে দুই কোচের ক্যারিয়ারে। স্পেনের লুইস দে লা ফুয়েন্তে ও আর্জেন্টিনার লিওনেল স্কালোনি, দুজনের কারোরই ক্লাব ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে দীর্ঘ কোচিং অভিজ্ঞতা নেই। তবুও আন্তর্জাতিক ফুটবলে ইউরো, কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপ জিতে নিজেদের সফলতার প্রমাণ দিয়েছেন তারা।
চলতি বছর কাতারে এই দুই দলের মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল ‘ফিনালিসিমা’ ম্যাচে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেই ম্যাচ বাতিল হয়ে যায়। ফলে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এবারই প্রথম একে অপরের মুখোমুখি হচ্ছে তারা। এর আগে বিশ্বকাপে মাত্র একবার দেখা হয়েছিল দুই দলের। ১৯৬৬ সালের সেই ম্যাচে লুইস আরতিমের জোড়া গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল আর্জেন্টিনা।
এবারের ফাইনালে থাকছে নতুন চমকও। আমেরিকান সংস্কৃতির অনুকরণে চ্যাম্পিয়ন দলের জন্য রাখা হয়েছে বিশেষ চ্যাম্পিয়নশিপ রিং। ফিফার ওয়েবসাইট অনুযায়ী, মূল ট্রফির পাশাপাশি ৩০টি রিং দেওয়া হবে বিজয়ী দলকে। একপাশে থাকবে বিশ্বকাপের অবয়ব, অন্যপাশে থাকবে চ্যাম্পিয়ন দেশের নিজস্ব পরিচিতি।
ফাইনালের আগে নিউ জার্সির আবহাওয়া নিয়েও ছিল শঙ্কা। কানাডার দাবানলের ধোঁয়া ও বায়ুদূষণের কারণে সতর্কতা জারি হয়েছিল। তবে ম্যাচের আগে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। খোলা স্টেডিয়ামে খেলার অভিজ্ঞতায়ও দুই দলের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। স্পেন পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি ম্যাচ এমন পরিবেশে খেলেছে, আর আর্জেন্টিনা ইতিমধ্যে তিনবার ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় খোলা স্টেডিয়ামে খেলেছে।