বিশ্বকাপ মানেই লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা আর্লিং হালান্ডদের আলোচনায় থাকা। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই তারকাদের ভিড়েও আলাদা করে নজর কাড়ছেন মরক্কোর ২৫ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড ইসমায়েল সাইবারি। অথচ একসময় চিকিৎসকদের আশঙ্কা ছিল, তিনি হয়তো কোনো দিন নিজের পায়ে ঠিকমতো দাঁড়াতেই পারবেন না। আজ সেই সাইবারিই বিশ্বকাপে একের পর এক গোল করে মরক্কোর নকআউট পর্বে ওঠার নায়ক।
টুর্নামেন্ট শুরুর আগে খুব বেশি পরিচিত ছিলেন না সাইবারি। কিন্তু বিশ্বকাপে এসে নিজেকে নতুন করে চিনিয়েছেন। ব্রাজিলের বিপক্ষে দৃষ্টিনন্দন গোলের পর স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচের দ্বিতীয় মিনিটে গোল করে টুর্নামেন্টের অন্যতম দ্রুততম গোলের রেকর্ড গড়েন তিনি। এরপর হাইতির বিপক্ষেও গোল করে ইতিহাসে নাম লেখান।
আটলান্টায় হাইতির বিপক্ষে ৪-২ গোলের জয়ে গোল করে মরক্কোর প্রথম ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেই গোল করার কীর্তি গড়েছেন সাইবারি। এর আগে ব্রাজিল ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষেও একটি করে গোল করেছিলেন তিনি।
গত শুক্রবারের জয়ের পর উচ্ছ্বসিত সাইবারি বলেন, ‘এটি আমার ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত।’ তবে তার এই সাফল্যের গল্প মোটেও সহজ ছিল না। স্পেনের তেরাসায় জন্ম নেওয়া সাইবারির শরীরে জন্মের পরপরই ধরা পড়ে জটিল এক শারীরিক ত্রুটি। চিকিৎসকেরা তখন আশঙ্কা করেছিলেন, তিনি হয়তো কখনো স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেই পারবেন না।
বিশেষ অর্থোপেডিক সাপোর্টের সাহায্যে দুই বছর বয়সে প্রথমবার হাঁটতে শেখেন তিনি। সেই সময়ের কথা স্মরণ করে সাইবারি বলেছিলেন, ‘সেই মেশিন আমাকে সাহায্য করেছিল। ভাগ্য ভালো যে সেটি কাজ করেছিল এবং আমি হাঁটতে পেরেছিলাম। ওই সময়ে ফুটবলার হওয়া তো দূরের কথা, মূল লক্ষ্য ছিল শুধু স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারা।’
পরবর্তীতে উন্নত জীবনের আশায় পরিবার নিয়ে বেলজিয়ামে চলে যান তিনি। সেখানে আন্ডারলেখটের একাডেমিতে যোগ দিলেও শুনতে হয়েছিল অপমানজনক কথা।
সাইবারি বলেন, ‘ওরা আমাকে বলেছিল, আমি নাকি মোটা। ওটা সত্যিই খুব কষ্টদায়ক ছিল। আমি ভালো খেলছিলাম এবং ফর্মেও ছিলাম। সেখানে খেলাটা ছিল সম্মানের, কিন্তু নতুন মৌসুম শুরুর ঠিক আগের দিন আমি এই দুঃসংবাদ পাই।’
তবে থেমে যাননি তিনি। প্রত্যাখ্যানকে শক্তিতে পরিণত করে মেচেলেন ও খেঙ্কের হয়ে নিজের প্রতিভার প্রমাণ দেন। পরে ডাচ ক্লাব পিএসভি আইন্দহোভেনে গিয়ে হয়ে ওঠেন ইউরোপের অন্যতম আলোচিত তরুণ তারকা। গত মৌসুমে ৩৭ ম্যাচে ১৯ গোল ও ৯ অ্যাসিস্ট করে ডাচ লিগের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন সাইবারি। তার পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে তাকে দলে ভেড়াতে ৫৫ মিলিয়ন ইউরো খরচ করতে রাজি হয়েছে বায়ার্ন মিউনিখ।
স্পেনে জন্ম এবং বেলজিয়ামের জাতীয় দলে খেলার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শিকড়ের টানে মরক্কোকেই বেছে নেন তিনি। সাইবারির ভাষায়, ‘ছোটবেলা থেকে আমি সব সময় বলেছি, মরক্কোর হয়ে খেলতে চাই; কারণ, আমার বাবা-মা ওখানকার।’
আজ মরক্কোর প্রায় ৪ কোটি মানুষের স্বপ্নের অন্যতম নাম ইসমায়েল সাইবারি। যে ছেলেটিকে একসময় হাঁটতেই পারবেন না বলা হয়েছিল, সেই তিনিই এখন বিশ্বকাপের মঞ্চে গোল করে দেশকে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন।