খুলনা থেকে ঢাকা
ভোর সোয়া ৬টা। রমনা পার্কে জড়ো হওয়ার কথা ছিল একদল যুবকের, কিন্তু হুট করেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে চারটি ভিডিওবার্তা— ‘আইনি বাধার কারণে রমনা পার্ক নয়, সবাই চলে আসুন বায়তুল মোকাররমের মেইন গেটে, সেখানে হবে মাশওয়ারা (মতবিনিময়)’। সেই মতবিনিময় শেষেই যাত্রাবাড়ীর বালুর মাঠে যাত্রা শুরু করে এক নতুন অধ্যায়। আপাতদৃষ্টিতে একে সাধারণ মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ মনে হলেও, আড়ালে বোনা হচ্ছিল এক ভয়ংকর উগ্রপন্থার জাল!
ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের জালে এবার ধরা পড়েছেন ‘বিশ্বের প্রথম মিউজিকমুক্ত ও শরিয়াহভিত্তিক মার্শাল আর্ট’ দাবি করা সংগঠন ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ (এফসিএস)-এর প্রধান শাহ আমানত সাবির ওরফে ‘উস্তাদ সাবির’ এবং তার সহযোগীরা।
অপারেশনাল ফান্ডের জন্য বড় কোনো ব্যাংক ডাকাতি নয়, এই কথিত ‘খাঁটি তাওহীদবাদী’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা বেছে নিয়েছিলেন সাধারণ মানুষের ওপর জুলুমের পথ। গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর রাত ১১টায় যশোরের মধুগ্রামের নির্জন রাস্তা দিয়ে ইজিবাইক চালিয়ে যাচ্ছিলেন কমল বিশ্বাস। হঠাৎ অন্ধকারের মধ্যেই তার ওপর চড়াও হন সাবির ও তার সঙ্গীরা, কমলের মুখের ওপর ধারালো অস্ত্র ধরে ছিনিয়ে নেওয়া হয় নগদ ১০ হাজার ৩০০ টাকা এবং পৌনে ৩ লাখ টাকার ইজিবাইকটি। ভয়ে এতদিন মুখ না খুললেও, গত ৫ জুলাই সাবিরের গ্রেপ্তারের ছবি পত্রিকায় দেখে আঁতকে ওঠেন কমল! চিনে ফেলেন সেই রাতের সেই ‘উস্তাদ’কে। ৭ জুলাই যশোর কোতোয়ালী থানায় কমলের দায়ের করা মামলার পর পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে সাবির স্বীকার করেছেন—হ্যাঁ, তহবিল সংগ্রহের জন্যই তারা এই ডাকাতি ও ছিনতাই করেছিলেন!
অন্ধকার রাতের জনমানবহীন রাস্তায় একের পর এক বোমা ফাটাচ্ছিল সাবির ও তার দল। আর সেসব ঘটনার ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছিল আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) অফিসিয়াল মিউজিক! বিস্ফোরণ শেষে ক্যামেরার সামনে ধারালো দা উঁচিয়ে সাবির হুংকার দেন—‘হে কুফফাররা...’! গোয়েন্দাদের হাতে আসা শাহ আমানত সাবিরের মোবাইল ফোন থেকে উদ্ধার হওয়া সেই ২ মিনিট ২৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফুটেজ পুরো তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে জানা যায়, সাবির দীর্ঘ সময় (২০১৮-২০২৫) ন্যাশনাল স্কুল অব বুত্থান মার্শাল আর্টসের খুলনা শাখা চালাতেন। কিন্তু প্রশিক্ষণের আড়ালে নিজের উগ্র মতাদর্শ ছড়ানোর চেষ্টায় মতবিরোধ হলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি পদত্যাগ করেন। এরপরই ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে খুলনার বড় মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ ঘটে ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’-এর। খুলনা ময়লাপোতার প্রধান কার্যালয়সহ যশোর, অভয়নগর, চাঁদপুরসহ বেশ কয়েকটি শাখা খোলা হয়।
সামাজিকমাধ্যমে ‘ইসলামিক রিয়েলিস্টিক সেল্ফ ডিফেন্স’ বা শরিয়াহভিত্তিক কুস্তি প্রতিযোগিতার নামে বিকাশ নম্বর দিয়ে তহবিল সংগ্রহ শুরু করেন তারা। গত মে মাসে ভারতীয় গণমাধ্যমে তাদের উগ্র কর্মকাণ্ডের খবর চাউর হলে নড়েচড়ে বসে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। পাল্টা জবাবে সাবির খুলনায় সংবাদ সম্মেলন করে ভারতের বিজেপি সরকার ও দেশীয় গোয়েন্দাদের তীব্র সমালোচনা করে নিজেদের ‘সাধু’ প্রমাণের চেষ্টা চালান।
অবশেষে ৪ জুলাই ঢাকা শাখার কার্যক্রম শুরু করতে গিয়েই সিটিটিসির জালে আটকা পড়েন শাহ আমানত সাবির এবং তার প্রধান সহযোগীরা, যার মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দল থেকে সদ্য বহিষ্কৃত নেতা আতাউল্লাহ শাহও রয়েছেন।
গত বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সাবির ও তার সহযোগী তানিমকে দ্বিতীয় দফায় আরও ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম আগামী ১২ জুলাইয়ের মধ্যে এই চাঞ্চল্যকর মামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।