কর্পোরেট জায়ান্ট দাবিদার ‘বিটিএল গ্রুপ’ এবং এর প্রধান নির্বাহী (সিইও) মির্জা আবুল বাশারের বিরুদ্ধে এবার সামনে এলো গাড়ি চুরির কাহিনী। লিখিত চুক্তি করে ভাড়ায় গাড়ি নিয়ে মাসের পর মাস ভাড়া পরিশোধ না করা, উল্টো মালিক গাড়ি ফেরত চাইলে তাকেই ভয়ভীতি ও ব্ল্যাকমেইল করার তথ্য উন্মোচন করেছে ‘টিম ব্লু প্রিন্ট’। এর আগে খামারিদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকার কোরবানি গরু কিনে ‘ফাঁকা চেক’ দিয়ে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে গ্রুপটির বিরুদ্ধে।
এই নতুন জালিয়াতির শিকার সাইফুল ইসলাম নামের এক যুবক। তথ্য ও নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর স্ট্যাম্পে আইনি চুক্তিপত্র করে ‘ঢাকা মেট্রো গ-২১-৬৮৫৪’ নম্বরের ব্যক্তিগত প্রাইভেটকার বিটিএল গ্রুপের কাছে মাসিক ৩৩ হাজার টাকা ভাড়ায় প্রদান করেন ওই যুবক সাইফুল। চুক্তি অনুযায়ী শুরুতে অগ্রিম হিসেবে মাত্র এক মাসের ভাড়া সাইফুলকে দেয় বিটিএল গ্রুপ। কিন্তু এরপর মাসের পর মাস পার হলেও সাইফুলের অ্যাকাউন্টে একটি টাকাও জমা পড়েনি। ভুক্তভোগী সাইফুল জানান, নিয়ম মেনেই চুক্তিপত্র করে গাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়। শুরুতে এক মাসের ভাড়া পরিশোধ করা হলেও আর একটা টাকাও দেওয়া হয়নি। প্রতিদিন অফিসে গিয়ে তাদের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললেও শুধু আশ্বাসই দেওয়া হয়।
মাসের পর মাস ভাড়া না পেয়ে নিরুপায় হয়ে সাইফুল ইসলাম যখন গাড়িটি ফেরত চান, তখন বিটিএল গ্রুপ শুরু করে চরম নাটকীয়তা। একেক দিন একেক কর্মকর্তা সাইফুলকে গাড়ির নতুন নতুন ভৌতিক লোকেশন দিতে থাকেন। কখনও বলা হয় গাড়ি ঢাকার বাইরে অফিশিয়াল ট্যুরে আছে, কখনও বলা হয় রংপুরে, আবার কখনও গল্প সাজানো হয় গাড়ি এখন কুয়াকাটায়! দিনের পর দিন কোটি টাকার সম্পত্তি এভাবে গায়েব হতে দেখে শেষ পর্যন্ত আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হন সাইফুল। গেল ১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর গুলশান থানায় লিখিত অভিযোগ করেন সাইফুল। কিন্তু বিটিএল গ্রুপের সিইও মির্জা আবুল বাশারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে বারবার ব্যর্থ হন বলে জানিয়েছেন থানার তদন্ত কর্মকর্তা আনোয়ার।
এরপর ২০২৬ সালের ৭ মার্চ ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে লিখিত অভিযোগ করেন সাইফুল। কিন্তু ডিবির কাছে গিয়ে সাইফুল যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, তা কোনো হলিউড থ্রিলারের চেয়ে কম নয়! সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘যেখানেই অভিযোগ করতে যেতাম বা যার সঙ্গেই কথা বলতাম, কিছুক্ষণের মধ্যেই মির্জা আবুল বাশার বিষয়টা জেনে যেতেন। এরপর তিনি ফোন করে সেই তথ্য জানাতেন। বিষয়টা আমাকে আরও আতঙ্কিত ও হতাশ করে তোলে।’ ডিবি বা থানায় অভিযোগ করার সঙ্গে সঙ্গেই সিইও মির্জা বাশারের সেই খবর জেনে যাওয়া প্রমাণ করে, প্রশাসনের ভেতরেও জালিয়াত চক্রের কোনো ‘স্পাই’ বা দোসর লুকিয়ে রয়েছে!
বর্তমানে সাইফুল ইসলামের দিন কাটছে চরম মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে। প্রতিদিন বিটিএল গ্রুপের কর্পোরেট অফিসে গিয়ে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে তাকে। উল্টো সিইও মির্জা বাশারের সিন্ডিকেট তাকে অদ্ভুত সব শর্ত দিয়ে জিম্মি করছে। সাইফুলের অভিযোগ— সিন্ডিকেটের লোকেরা তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বলছে, ‘গাড়ি চাইলে টাকা পাবেন না। আবার কখনও বলে টাকা চাইলে গাড়ি পাবেন না।’ নিজের গাড়ি আর পাওনা টাকা দুটির কোনোটিই না পেয়ে এখন দেউলিয়া হওয়ার পথে এই যুবক।
একদিকে, খামারির কাছ থেকে কোরবানির গরু কিনে সাড়ে ১২ লাখ টাকার বাউন্স চেক দেওয়া, অন্যদিকে চুক্তি করে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ি আত্মসাৎ করা, দুটি ঘটনাতেই অপরাধের ধরন এবং অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান একই—বিটিএল গ্রুপ এবং এর সিইও মির্জা আবুল বাশার।