দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন খামারি
চকচকে অফিস, নামী কর্পোরেট ব্র্যান্ড আর প্যাড-স্ট্যাম্পের ছড়াছড়ি। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই যে, এই কর্পোরেট লেবাসের আড়ালে লুকিয়ে আছে ঠকানোর এক সুনিপুণ ‘ব্লুপ্রিন্ট’। কোরবানির ঈদের ঠিক আগে এমনই এক সুপরিকল্পিত ফাঁদ পাতা হয়েছিল। দেওয়া হয়েছিল চেক, দেওয়া হয়েছিল বিল পরিশোধের লিখিত প্রতিশ্রুতি বা ওয়ার্ক অর্ডারও। কিন্তু দিন শেষে যখন টাকা তোলার সময় এলো, তখনই খসে পড়ল মুখোশ! জানা গেল, ব্যাংক হিসাবে এক টাকাও নেই! তাহলে এটি কি শুধুই ব্যবসায়িক অব্যবস্থাপনা, নাকি কর্পোরেট লেবাসে সুপরিকল্পিত আর্থিক প্রতারণা?
অনুসন্ধানে জানা যায়, কোরবানির ঈদের বাজারে বড় ক্রেতা সেজে ‘রংধনু এগ্রো’র খামার থেকে বেছে বেছে ৮টি বড় গরু কেনে প্রতিষ্ঠানটি। চুক্তি অনুযায়ী গরুগুলোর মূল্য পরিশোধের জন্য ‘বিটিএল ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রি’ নামের একটি কর্পোরেট হিসাব থেকে সাড়ে ১২ লাখ টাকার ইসলামী ব্যাংকের একটি চেক দেওয়া হয়। বাকি ২৮ হাজার টাকা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধের কথা জানানো হয়েছিল।
শুধু মৌখিক কথাই নয়, বিটিএল গ্রুপের পক্ষ থেকে একটি অফিশিয়াল ওয়ার্ক অর্ডারও দেওয়া হয়েছিল, যেখানে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে—গরু ক্রয়ের বিল পরিশোধের সম্পূর্ণ দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানটি নেবে। একই সঙ্গে গরু ডেলিভারির পর নগদ অর্থ পরিশোধের লিখিত প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল।
সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। বিটিএল গ্রুপের কথামতো ৮টি গরু সময়মতো সরবরাহও করে রংধনু এগ্রো। কিন্তু বিপত্তিটা বাঁধল যখন খামার মালিক টাকা তোলার জন্য ব্যাংকে চেকটি জমা দিলেন। ব্যাংক থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হলো—সংশ্লিষ্ট হিসাবে চেকের সমপরিমাণ কোনো অর্থই নেই! অর্থাৎ, এটি ছিল সম্পূর্ণ একটি ‘বাউন্স’ বা ফাঁকা চেক।
চেক বাউন্স হওয়ার পর শুরু হয় বিটিএল গ্রুপের কালক্ষেপণের খেলা। আজ নয় কাল, কাল নয় পরশু—বারবার অর্থ পরিশোধের মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া হতে থাকে খামার কর্তৃপক্ষকে। দেখতে দেখতে কেটে গেছে কয়েক সপ্তাহ। কিন্তু প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি মিললেও মেলেনি পাওনা টাকা।
রংধনু এগ্রোর মালিক হাবিব জানান, ‘আটটি গরু দিয়েছি। কোরবানির মৌসুমে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে কষ্ট করে গরুগুলো প্রস্তুত করেছিলাম। কিন্তু আজ পর্যন্ত একটি টাকাও পাইনি। চেক দিয়েছিল, সেটারও টাকা তুলতে পারিনি। বারবার শুধু সময় নিয়েছে, কিন্তু পাওনা পরিশোধ করেনি। আমরা এখন চরম আর্থিক সংকটে পড়েছি এবং মানসিকভাবেও চিন্তিত।’
এমন অভিযোগের সত্যতা জানতে যখন বিটিএল গ্রুপের শীর্ষ মহলে যোগাযোগ করা হয়, তখন সামনে আসে দায় এড়ানোর এক চরম নাটকীয়তা। বিটিএল গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মির্জা আবুল বাশারের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর ধরেন। বলেন, ‘আমি এ ধরনের কোনো ঘটনার বিষয়ে অবগত নই। আমাদের অনেকগুলো কনসার্ন বা অঙ্গপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে পরে জানাতে পারব।’ অথচ রংধনু এগ্রোর দাবি, প্রতিনিয়ত আবুল বাশারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ চলছে।
একটি প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট থেকে সাড়ে ১২ লাখ টাকার চেক চলে গেল, অফিশিয়াল প্যাডে ওয়ার্ক অর্ডার ইস্যু হলো, অথচ প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কিছুই জানেন না—এমন দাবি ইনভেস্টিগেশন টিমের কাছে অত্যন্ত রহস্যজনক বলে মনে হয়েছে।
লুটের এই ব্লুপ্রিন্টের দ্বিতীয় চরিত্র হলেন বিটিএল গ্রুপের ম্যানেজার আলি আব্বাস। খামার থেকে গরু রিসিভ করা এবং খামার কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা ওয়ার্ক অর্ডারটিতেও তার স্বাক্ষর রয়েছে। কিন্তু অর্থ পরিশোধের বিষয়ে প্রশ্ন করতেই তিনি নিজেকে ‘ছোট চুনোপুঁটি’ দাবি করে হাত ধুয়ে ফেলেন।
আলি আব্বাস জানান, ‘আমার দায়িত্ব ছিল শুধু গরু রিসিভ করা। আমি তা করেছি। আমি প্রতিষ্ঠানের বড় কোনো কর্মকর্তা নই। আর্থিক লেনদেন বা বিল পরিশোধের বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’
ম্যানেজার আলি আব্বাসের এই বক্তব্যেই লুকিয়ে আছে আসল রহস্য। যদি আর্থিক বিষয়ে তার কোনো দায়িত্ব বা এখতিয়ার না-ই থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠানের ক্রয়সংক্রান্ত অফিশিয়াল ওয়ার্ক অর্ডারটি কীভাবে তার স্বাক্ষরে জারি হলো? আর যদি প্রতিষ্ঠানের সিইওসহ শীর্ষ কর্মকর্তারাও এই বিষয়ে অন্ধকারেই থাকেন, তাহলে লাখ লাখ টাকার ৮টি গরু ক্রয়, চেক ইস্যু এবং ওয়ার্ক অর্ডার প্রদানের মতো বড় সিদ্ধান্তগুলো পর্দার আড়ালে নিল কারা?
একদিকে বাউন্স হওয়া চেক, অন্যদিকে লিখিত প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও অর্থ পরিশোধ না করার এই ধূর্ত কৌশল আর সাধারণ বাণিজ্যিক বিরোধের সীমায় নেই। এটি স্পষ্টত একটি সুপরিকল্পিত আর্থিক অনিয়ম এবং কর্পোরেট প্রতারণা।
পাওনা আদায়ের সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর, শেষ পর্যন্ত সুবিচারের আশায় রাজধানীর গুলশান থানায় গত ২৩ মে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করে ভুক্তভোগী রংধনু এগ্রো কর্তৃপক্ষ। তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) সাইফুল জানান, তারা যে গরু কিনে টাকা পরিশোধ করেনি, এ তথ্য সত্য।
৮টি গরু, ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকার চেক, একটি ওয়ার্ক অর্ডার এবং শোধ না হওয়া পাওনা—এই মেগা প্রতারণার পেছনে লুকিয়ে থাকা রাঘববোয়ালদের টেনে বের করার দায়িত্ব এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।