স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার দাবিতে সবচেয়ে সরব রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একটি ছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির যুক্তি ছিল, স্থানীয় সরকার জনগণের নিত্যদিনের সেবা ও উন্নয়নের প্রতিষ্ঠান; এখানে জাতীয় রাজনীতির সংঘাত, দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা প্রতীকের লড়াই যত কম থাকবে, ততই স্থানীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে।
সেই চিন্তা থেকেই নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের কাছে ‘নির্দলীয় ও প্রতীকবিহীন’ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তাব দিয়েছিল দলটি। কিন্তু সেই এনসিপিই এখন সেই সংস্কার মানছে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে দলীয় প্রতীক বাতিল হওয়ার পর দলটি বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও পৌরসভায় নিজেদের সমর্থনপুষ্ট প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করতে শুরু করেছে। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে, যে দল নির্দলীয় নির্বাচনের পক্ষে ছিল, তারা কি বাস্তবে আবারও দলীয় রাজনীতির পথেই হাঁটছে? তাহলে কেন সংস্কারের কথার এত ফুলঝুরি?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি কেবল একটি দলের কৌশলগত সিদ্ধান্ত নয়; বরং বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতির একটি গভীর বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। আইন পরিবর্তন করা যত সহজ, রাজনৈতিক আচরণ ও সংস্কৃতি পরিবর্তন করা তত সহজ নয়।
কয়েক মাস আগেও এনসিপির নেতারা প্রকাশ্যে বলেছিলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলীয় কোন্দল ও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করতে হলে দলীয় প্রতীক ও আনুষ্ঠানিক দলীয় প্রার্থী ব্যবস্থা বাতিল করতে হবে। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইন সংশোধন করে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন নিষিদ্ধ করে।
কিন্তু আইন পরিবর্তনের পর বাস্তব রাজনীতির হিসাব-নিকাশ যেন ভিন্ন চিত্র দেখাতে শুরু করেছে। গত ২৯ মার্চ পাঁচটি সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে এবং ১০ মে প্রথম ধাপে ১০০ উপজেলা ও পৌরসভায় সমর্থনপুষ্ট প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করে এনসিপি। এতে স্পষ্ট হয়েছে, নির্বাচন আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দলীয় হলেও দলটি নির্বাচনী মাঠে নিজেদের সাংগঠনিক উপস্থিতি বজায় রাখতে আগ্রহী।
সমালোচকদের মতে, এখানেই তৈরি হয়েছে মূল দ্বন্দ্ব। কারণ নির্দলীয় নির্বাচনের দর্শন হলো, ভোটাররা প্রার্থীকে তার ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, দক্ষতা ও সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করবেন। কিন্তু কোনো দল যদি আগাম সমর্থনপ্রাপ্ত প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ করে, তাহলে সেই নির্বাচনে দলীয় পরিচয় পরোক্ষভাবে ফিরেই আসে।
ফলে যে দল একসময় দলীয় প্রভাব কমানোর কথা বলেছিল, এখন তারাই সেই প্রভাবের একটি নতুন রূপ সামনে আনছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এর পেছনে রাজনৈতিক বাস্তবতারও বড় ভূমিকা রয়েছে। দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি সংগঠিত শক্তি যখন তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে ব্যস্ত, তখন এনসিপি হয়তো মনে করছে যে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকলে তারা নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। সে কারণেই আদর্শিক অবস্থানের চেয়ে বাস্তব রাজনৈতিক সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের মতে, রাজনৈতিক দলগুলো যদি আনুষ্ঠানিকভাবে না হলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে এভাবে প্রার্থী নির্ধারণ করতে থাকে, তাহলে প্রকৃত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রতিযোগিতায় আগ্রহ হারাতে পারেন। এতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আবারও দলীয়করণের দিকে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
অবশ্য এনসিপি নিজেদের অবস্থানকে আত্মবিরোধিতা হিসেবে দেখতে রাজি নয়।
দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, এবারের নির্বাচনে এনসিপির কোনো আনুষ্ঠানিক দলীয় প্রার্থী থাকবে না। কারণ নির্বাচন হচ্ছে দলীয় প্রতীক ছাড়া। তবে যেসব প্রার্থীর প্রতি দলের রাজনৈতিক সমর্থন থাকবে, তারা স্বাভাবিকভাবেই সমর্থনপুষ্ট হিসেবে পরিচিত হবেন।
সারোয়ার তুষারের ভাষায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে এনসিপি সাংগঠনিক বিস্তারের একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে। সমর্থন পাওয়া ব্যক্তিরা স্থানীয় পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক বিকাশে ভূমিকা রাখবেন। একই সঙ্গে বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্যও সমর্থনপ্রাপ্তদের বিষয়ে আগাম অবস্থান স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে মনে করে দলটি।
সারোয়ার তুষারের মতে, বাস্তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কখনোই পুরোপুরি রাজনীতিমুক্ত থাকে না। আইনগতভাবে রাজনৈতিক দলগুলো অংশ না নিলেও মাঠের বাস্তবতায় সাধারণত সবাই জানেন কোন প্রার্থী কোন রাজনৈতিক ধারার কাছাকাছি। ফলে এনসিপি যে কাজ করছে, সেটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়।
তিনি ইসির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। বিএনপির সমর্থিত বলে পরিচিত কয়েকজন সিটি করপোরেশন প্রশাসকের আগাম প্রচারণার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে ইসির দৃশ্যমান উদ্বেগ খুব একটা দেখা যায়নি।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বিষয়টিকে আরও বাস্তবধর্মীভাবে দেখছেন। তার মতে, দলীয় প্রতীক না থাকলে নির্বাচনকে নির্দলীয়ই বলা হবে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
ড. সাব্বির বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক প্রভাব ও স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোনো দল সমর্থন দিলেই যে একজন প্রার্থী জয়ী হবেন, তার নিশ্চয়তা নেই। আবার দলীয় সমর্থন ছাড়াও অনেক প্রার্থী জয়ী হতে পারেন।
ড. সাব্বির আহমেদের মতে, শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সরকারের সাফল্য নির্ভর করে জনগণকে কতটা কার্যকর ও স্বচ্ছ সেবা দেওয়া হচ্ছে তার ওপর। নির্বাচনের ধরন যাই হোক, জনপ্রতিনিধিরা যদি দুর্নীতিমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করতে না পারেন, তাহলে পুরো ব্যবস্থার উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যাবে।
তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে যখন একাধিক দল নিজেদের সমর্থনপুষ্ট প্রার্থীদের নিয়ে সক্রিয় হবে, তখন সংঘাত ও উত্তেজনার আশঙ্কাও বাড়তে পারে। বিশেষ করে বড় রাজনৈতিক দলগুলো মাঠে সক্রিয় হলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হতে পারে।
সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে এনসিপির বর্তমান অবস্থান বাংলাদেশের রাজনীতির এক চিরচেনা বাস্তবতাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। আদর্শের ভাষায় সবাই নির্দলীয় নির্বাচনের কথা বললেও, নির্বাচনের মাঠে পৌঁছে প্রায় সবাই রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখতে চায়।
ফলে প্রশ্নটি এখন আর শুধু এনসিপিকে ঘিরে নয়। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কি সত্যিই কখনো দলীয় প্রভাবমুক্ত হতে পারবে, নাকি দলীয় প্রতীক চলে গেলেও দলীয় রাজনীতি থেকে যাবে অন্য কোনো নামে? সেই উত্তরই হয়তো মিলবে আসন্ন নির্বাচনের মাঠের বাস্তবতায়।