বাইরে আকিজ গ্রুপের মলাটবদ্ধ ঝকঝকে প্যাকেট। ভেতরে সুস্বাদু ‘আকিজ রুটি’ কিংবা ‘বাটারবন’। সাধারণ মানুষ পরম তৃপ্তিতে যে খাবার মুখে তুলছেন, তা কোনো অত্যাধুনিক ও হাইজেনিক কারখানায় নয়, বরং তৈরি হচ্ছিল মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ভেতরে। সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের আড়ালে হাসপাতালের ওটি-র (অপারেশন থিয়েটার) ঠিক পাশেই চলছিল আকিজ গ্রুপের এই বাণিজ্যিক বেকারির বিশাল যজ্ঞ। আর এই বেকারির ময়দা, চিনি আর নোংরা আবর্জনার কারণেই ওটি-র ভেতরে রাজত্ব করছিল ঝাঁকে ঝাঁকে মাছি আর তেলাপোকা। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আকস্মিক অভিযানে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের এই ভয়ঙ্কর ‘বেকারি কেলেঙ্কারি’ এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
মেডিক্যাল সায়েন্স বলে, হাসপাতালের ওটি বা অপারেশন থিয়েটার হতে হবে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত এবং বিশ্বের সবচেয়ে ‘ক্লিন স্পেস’। অথচ আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের রহস্যজনক মৃত্যুর পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্তে যে রোমহর্ষক চিত্র উঠে এসেছে, তা দেখে চোখ কপালে উঠেছে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের।
তদন্তে দেখা যায়, হাসপাতালের ওটি-তে অপারেশন চলাকালীন কাটা স্থান বা উন্ড সাইটে ও প্রসূতি মায়ের জরায়ুর ওপর ভনভন করে বসছে মাছি! সার্জনদের গ্লাভস আর ট্রলিতেও মাছি-তেলাপোকার মেলা। আর এই সবকিছুর মূলে রয়েছে হাসপাতালের ভেতরে থাকা আকিজ গ্রুপের ওই বেকারি। প্রতিদিন যেখানে হাজার হাজার রুটি ও বাটারবন তৈরি হতো, সেই সুমিষ্ট গন্ধ আর কাঁচামালের লোভেই পুরো হাসপাতাল পরিণত হয়েছে মাছি-তেলাপোকার অভয়ারণ্যে। মুনাফা কামাতে গিয়ে রোগীদের জীবনকে নরকে ঠেলে দিয়েছে আকিজ ও আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী যখন নিজেই এই অবৈধ বেকারির কারখানা ও তার চারপাশে দুর্গন্ধযুক্ত পচা পানি খুঁজে পান, তখন বেরিয়ে আসে হাসপাতালটির কাঠামোগত জালিয়াতিও। ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ও আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, হাসপাতালের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় বাণিজ্যিক বেকারি চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শুধু তাই নয়, নকশার তোয়াক্কা না করে যেখানে-সেখানে এক্সটেনশন বিল্ডিং বানিয়ে বেকারি ও হাসপাতালের ওটি-কে পাশাপাশি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। কারিগরি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বায়ু চলাচলের ভুল কাঠামোর কারণে বেকারির যাবতীয় নোংরা বাতাস সরাসরি ওটি-র বাতাসকে দূষিত করছিল, যা সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুদের জন্য ছিল সাক্ষাৎ ডেথ ট্র্যাপ বা মৃত্যুর ফাঁদ। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, পরিদর্শনের সময় বেকারীর কোন কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি।
আকিজ গ্রুপের মতো একটি শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী কীভাবে দেশের জনস্বাস্থ্য ও সাধারণ মানুষের সরলতাকে এভাবে পুঁজি করলো, তা নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন সচেতন মহল। ব্র্য্যান্ডের লোগো দেখে মানুষ যে রুটি ও বাটারবন কিনে খাচ্ছেন, তা আসলে হাসপাতালের ওটি-র পাশে ছড়ানো ব্যাকটেরিয়া ও নোংরা পরিবেশে তৈরি। একদিকে বেকারির কারণে ওটি দূষিত হয়ে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হলো, অন্যদিকে হাসপাতালের বর্জ্য ও জীবাণুর বাতাসে তৈরি রুটি-বান খেয়ে কত মানুষ প্রতিনিয়ত অসুস্থ হচ্ছেন, তার কোনো হিসাব নেই।
এই মহা জালিয়াতি ও অপরাধ যখন গণমাধ্যমের ক্যামেরায় বন্দি হতে শুরু করে, তখনই নিজেদের পুরোনো পাপ ঢাকতে হিংস্র হয়ে ওঠে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের স্টাফরা। শনিবার সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকদের ওপর লাঠিসোটা নিয়ে বর্বরোচিত হামলা চালায় তারা। সন্তান হারানো বাবা হাবিবুর রহমানের মামলায় পুলিশ তদন্ত শুরু করতেই হাসপাতালের অনেক কর্মকর্তা এখন নজরদারিতে। আগামী ৩ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ের ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করার কথা রয়েছে।
সেবার মুখোশ পরা আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ও আকিজ গ্রুপের এই যৌথ ‘ডেথ সিন্ডিকেট’-এর মুখোশ এবার পুরোপুরি উন্মোচিত। মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এই চক্রের শীর্ষ কর্তাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনা এখন কোটি মানুষের দাবি।