পবিত্র রমজান মাস শুরুর সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা তাদের ঈমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ জাকাত আদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জাকাত ইসলাম ধর্মে বাধ্যতামূলক এক ধরনের দান; যার লক্ষ্য অসচ্ছল ব্যক্তিদের সহায়তা করা এবং অর্থনৈতিক সাম্য বজায় রাখা।
অনেকে আধ্যাত্মিক সওয়াবের আশায় রমজান মাসে জাকাত দেওয়া পছন্দ করেন। তবে এটি বছরের যেকোনো সময় আদায় করা যায়।
গত রমজানের তুলনায় এবার সোনার দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আগে যা ছিল প্রতি আউন্স প্রায় ২ হাজার ৯০০ ডলার, আজ তা বেড়ে ৫ হাজার ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে।
সোনার এই উচ্চমূল্য সরাসরি দুটি উপায়ে জাকাতকে প্রভাবিত করে। প্রথমত, এটি জাকাত দেওয়ার যোগ্যতার সীমা বা নিসাব পরিবর্তন করে দেয়। এর অর্থ হলো, অনেক ব্যক্তি এখন জাকাত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পেতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, যাদের কাছে সোনা গচ্ছিত আছে, তাদের যে পরিমাণ জাকাত দিতে হবে তার অঙ্ক বেড়ে যায়; যার ফলে সামগ্রিকভাবে জনকল্যাণমূলক কাজে বড় অবদান রাখার সুযোগ তৈরি হয়।
জাকাতের উদ্দেশ্য, গণনা পদ্ধতি এবং এর ধরণ বুঝতে সাহায্য করার জন্য নিচে কিছু সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।
জাকাত ও সদকা কী
জাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি, যা ইবাদতের একটি মূল অংশ। জাকাত শব্দের অর্থ হলো পবিত্রতা বা বৃদ্ধি। কোরআনে সম্পদকে পবিত্র করার, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং অভাবীদের সাহায্য করার মাধ্যম হিসেবে জাকাত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যাদের সম্পদের পরিমাণ জাকাত দেওয়ার জন্য নির্ধারিত সর্বনিম্ন সীমায় (নিসাব) পৌঁছেছে, তাদের জন্য প্রতি বছর মোট সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ (২ দশমিক ৫ শতাংশ বা ৪০ ভাগের ১ ভাগ) জাকাত দেওয়া বাধ্যতামূলক।
অন্যদিকে সদকা হলো যেকোনো সময় দেওয়া যায় এমন এক ঐচ্ছিক দান।
জাকাত দেওয়া কার জন্য আবশ্যক
প্রাপ্তবয়স্ক সেই সব মুসলমানের জন্য জাকাত ফরজ, যাদের সম্পদ নিসাবের সীমা অতিক্রম করেছে। নিসাব হলো সেই ন্যূনতম সম্পদের পরিমাণ, যার ওপরে থাকলে জাকাত দেওয়া আবশ্যক হয়।
এ বছর সোনার নিসাব ধরা হয়েছে ৮৫ গ্রাম (৩ ট্রয় আউন্স), যা বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী প্রায় ১৫ হাজার ডলারের সমান। গত বছর এই নিসাব ছিল প্রায় ৮ হাজার ডলার।
যদিও আধুনিক সময়ে অনেক সংস্থা ৮৫ গ্রাম সোনাকে নিসাব নির্ধারণের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করে, প্রাচীন হিসেবে এটি ৭ দশমিক ৫ তোলা—যা মূল্যবান ধাতু মাপার প্রচলিত একক এবং প্রায় ৮৭ দশমিক ৪৮ গ্রামের সমান।
সোনার পাশাপাশি রুপার মাধ্যমেও নিসাব নির্ধারণ করা যায়। রুপার ক্ষেত্রে নিসাব হলো ৫৯৫ গ্রাম (১৯ ট্রয় আউন্স)।
এটি বিভিন্ন অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে এবং জাকাতকে সর্বস্তরের মানুষের জন্য প্রাসঙ্গিক করে তোলে। যদি কোনো মুসলমানের সম্পদ টানা এক চন্দ্রমাস (এক বছর) এই সীমার ওপরে থাকে, তাহলে তাকে জাকাত দিতে হবে।
সোনার মালিক হলে জাকাত গণনা পদ্ধতি
আপনার কাছে যদি সোনার বার, মুদ্রা বা অলঙ্কার থাকে, তাহলে এর জাকাত হিসাব করতে হবে বর্তমান বাজার মূল্যের ওপর ভিত্তি করে; কেনার সময়কার দামের ওপর নয়।
সোনার সঠিক মূল্য জানতে হলে এর ওজন (ট্রয় আউন্স) এবং বিশুদ্ধতা (ক্যারেট) জানা প্রয়োজন। ১ ট্রয় আউন্স সমান ৩১ দশমিক ১০৩৫ গ্রাম।
প্রতি ট্রয় আউন্স ৫ হাজার ১০০ ডলার হিসাবে ১ গ্রাম খাঁটি সোনার দাম পড়ে প্রায় ১৬৪ ডলার।
ক্যারেট দিয়ে সোনার বিশুদ্ধতা মাপা হয়। ২৪ ক্যারেট হলো একদম খাঁটি সোনা। ক্যারেট যত কম হয় (যেমন ২২, ১৮ বা ৯), তার মানে হলো তাতে রুপা, তামা বা দস্তার মতো সস্তা ধাতুর মিশ্রণ রয়েছে।
সোনার বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতে স্বর্ণকাররা গয়নার গায়ে ২৪কে বা ৯৯৯ (৯৯.৯% খাঁটি) এর মতো ছাপ দিয়ে থাকেন।
যেমন, ১৮ ক্যারেট সোনার গায়ে সাধারণত ৭৫০ লেখা থাকে; যার অর্থ হলো এটি ৭৫ শতাংশ খাঁটি।
উল্লেখ্য, ব্যবহারের অলঙ্কার এবং বিনিয়োগের জন্য রাখা সোনার ওপর জাকাত প্রযোজ্য হবে কি না, সে বিষয়ে বিভিন্ন ইসলামি চিন্তাধারার মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে।
জাকাত কখন দিতে হয়
যখনই কোনো মুসলমানের সম্পদ ন্যূনতম সীমা (নিসাব) অতিক্রম করে, তখন থেকে তার ওপর জাকাত দেওয়া আবশ্যক হয়ে যায়—যদি সেই সম্পদ টানা এক চন্দ্রমাস বা হিজরি বছর তার মালিকানায় থাকে। অর্থাৎ, যদি কারো সম্পদ পুরো এক বছর ধরে এই ন্যূনতম সীমার ওপরে থাকে, তাহলে তিনি জাকাত দিতে বাধ্য।
তবে বছরের মাঝামাঝি সময়ে যদি সম্পদের পরিমাণ এই সীমার নিচে নেমে যায়, তাহলে জাকাত দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
উদাহরণস্বরূপ, যদি কারো সম্পদ কয়েক মাস নিসাব সীমার ওপরে থাকে কিন্তু বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তা কমে সীমার নিচে নেমে যায়, তাহলে তাকে জাকাত দিতে হবে না।
কেবল তখনই জাকাত দেওয়া বাধ্যতামূলক হয়, যখন সম্পদ পুরো একটি চন্দ্রবছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ওই ন্যূনতম সীমার ওপরে থাকে।
যদি কেউ বিগত বছরগুলোতে জাকাত দিতে ভুলে যান বা না দিয়ে থাকেন, তাহলে তাকে পেছনের হিসাব করে সেই পাওনা জাকাত পরিশোধ করতে হবে।
জাকাত সরাসরি অসচ্ছল মানুষের হাতে দেওয়া যায় অথবা বিশ্বস্ত দাতব্য সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও দেওয়া যায়, যারা এটি নিয়মমাফিক বণ্টন করে।
নিজের আশপাশের মানুষদের সাহায্য করাকে উৎসাহিত করা হলেও, যেখানে বেশি প্রয়োজন সেখানে আন্তর্জাতিকভাবেও জাকাত দেওয়া যেতে পারে।
ধনীদের সম্পদের একটি অংশ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা দেওয়ার মাধ্যমে জাকাত সম্পদকে গুটিকয়েক মানুষের হাতে কুক্ষিগত হওয়া থেকে রক্ষা করে।
এটি সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে, অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখে এবং সমাজে আয়-বৈষম্য কমাতে সাহায্য করে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা