জাতীয়তাবাদী দর্শনের ভিত্তিতে চার দশকেরও বেশি সময় আগে জন্ম নেওয়া সংগঠনটির লক্ষ্য ছিল আকাশচুম্বী। লক্ষ্য ছিল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তৃণমূল মানুষের কাছে জাতীয়তাবাদী আদর্শকে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু ৪৫ বছরের যাত্রাপথ শেষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন (জাসাস) আজ এক অদ্ভুত পরিস্থিতির চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে। যে প্রত্যাশা আর প্রতিশ্রুতি নিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা সময়ের আবর্তে যেন কেবল দলীয় সভার কোরাস গাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
১৯৭৮ সালে যখন জাসাস প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন এর মূল শক্তি ছিল শিল্পী-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ সমাহার। কিন্তু বর্তমানে জাসাসের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি এখন মূলত জাতীয় ও দলীয় দিবসভিত্তিক আনুষ্ঠানিকতার একটি আধার মাত্র। নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চা, নাট্য প্রযোজনা কিংবা সংগীতের মৌলিক সৃষ্টি, এসবে জাসাস আজ প্রায় অনুপস্থিত। সংগঠনের এক সাবেক নেতা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘জাসাস এখন কেবল রাজপথের মিছিল মিটিংয়ে শোভাবর্ধনকারী অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকৃত সাংস্কৃতিক বিপ্লব সেখানে নেই।’
সাংগঠনিক দুর্বলতার সবচেয়ে বড় ক্ষত ফুটে উঠেছে এর নেতৃত্বে। ২০২১ সালের ৬ নভেম্বর হেলাল খানকে আহ্বায়ক ও জাকির হোসেন রোকনকে সদস্যসচিব করে ৭১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তিন বছরের মেয়াদ শেষ হতে চললেও আজ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি উপহার দিতে পারেনি বর্তমান নেতৃত্ব। এই দীর্ঘ নেতৃত্বশূন্যতা সংগঠনের চেইন অব কমান্ডকে ভেঙে ফেলেছে।
অভিনেতা ওয়াসীমুল বারী রাজীবের সময়কালকে জাসাসের ‘'স্বর্ণযুগ’ বলে মনে করেন অনেকে। রাজীবের সাংগঠনিক দক্ষতা এবং তারকা ইমেজের কারণে জাসাস মূলধারার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি সমীহ জাগানিয়া নাম ছিল। কিন্তু তার মৃত্যুর পর সংগঠনটি ধীরে ধীরে এক স্থবির এবং দ্বিধাবিভক্ত গোষ্ঠীতে পরিণত হয়।
জাসাসের ভেতরে অনৈক্য এখন ওপেন সিক্রেট। মূল কমিটির বাইরে যুগ্ম আহ্বায়ক ও সুরকার ইথুন বাবুর নেতৃত্বে একটি সক্রিয় বলয় বিভিন্ন সময় নিজস্ব ব্যানারে কর্মসূচি পালন করে আসছে। অন্যদিকে জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী মনির খানের নেতৃত্বেও রয়েছে আলাদা অনুসারী গোষ্ঠী। এই অভ্যন্তরীণ বিভক্তি কেবল সংগঠনের শক্তিই হ্রাস করেনি, বরং নতুন প্রজন্মের প্রতিভাবান কর্মীদের প্রবেশের পথও রুদ্ধ করে দিয়েছে। যদিও সদস্যসচিব জাকির হোসেন রোকন বরাবরই গ্রুপিংয়ের কথা অস্বীকার করে একে ‘ব্যক্তিগত উদ্যোগ’ বলে দাবি করেন, তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন কথা বলছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সাংস্কৃতিক শাখাগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত জোরালো। জাসাসের ব্যর্থতা বুঝতে গেলে অন্যান্য দলের সাংস্কৃতিক ফ্রন্টগুলোর দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন—
জাসাস বনাম উদীচী (বামপন্থী ঘরানা): উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী রাজনৈতিক দল (সিপিবি) বা বাম দর্শনের ছায়াতলে থাকলেও তারা সারাবছর নিয়মিত নাট্যচর্চা, গণসংগীত ও চলচ্চিত্র উৎসবের মাধ্যমে নিজেদের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় ধরে রেখেছে। এমনকি প্রতিকূল সময়েও তারা রাজপথ এবং মঞ্চ, উভয় ক্ষেত্রেই সরব। সেখানে জাসাস দলীয় কর্মসূচির বাইরে কোনো পাবলিক ডোমেইন তৈরি করতে ব্যর্থ।
জাসাস বনাম আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক বলয়: আওয়ামী লীগের সরাসরি সাংস্কৃতিক অঙ্গসংগঠন না থাকলেও তারা ‘বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট’ বা ‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট’-এর মতো বিশাল একটি সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি করতে পেরেছে। গত ১৫ বছরে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে তারা সিনেমা, নাটক এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেছে। সেখানে জাসাস তার দীর্ঘ সময়ের প্রতিকূলতাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করালেও, পর্দার আড়ালে নতুন কনটেন্ট বা প্রতিভা তৈরির কোনো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে পারেনি।
জাসাসের এই ক্ষয়িষ্ণু দশা নিয়ে ওরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার আর্ট বিভাগের টিচিং ফেলো ইফতি শাহরিয়ার বলেন, ‘সাংস্কৃতিক সংগঠনের মূল শক্তি হলো চর্চা। জাসাসের সেই প্র্যাকটিস ল্যাবটাই আজ নষ্ট হয়ে গেছে। তারা রাজনৈতিক আনুগত্যকে শিল্পের ওপরে স্থান দিয়েছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম বিষয়টিকে দেখছেন আরও বৃহত্তর দৃষ্টিকোণে। তার মতে, ‘রাজনৈতিক আদর্শের সামাজিকায়ন ঘটে সংস্কৃতির মাধ্যমে। জাসাস যদি কেবল দিবস পালন করে, তবে তাদের রাজনৈতিক দর্শন নতুন প্রজন্মের মস্তিষ্কে পৌঁছাবে না।’
বর্তমানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জাসাসের সামনে বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের জড়তা কি রাতারাতি কাটানো সম্ভব? সদস্যসচিব জাকির হোসেন রোকন আশাবাদী। তিনি বলছেন, ‘বিগত সময়ে আমাদের হলরুম দেওয়া হতো না, আমাদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল। এখন সময় এসেছে মাঠপর্যায়ে সংগঠনকে ঢেলে সাজানোর।’
কিন্তু সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন ভিন্ন কথা। কেবল জেলা কমিটি ঘোষণা বা রাজপথে ব্যানার নিয়ে দাঁড়ানোই পুনরুত্থান নয়। জাসাসকে যদি তার হারানো জৌলুস ফিরে পেতে হয়, তবে তাকে দলীয় বৃত্তের বাইরে এসে গণমানুষের সংস্কৃতির সাথে যুক্ত হতে হবে। নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা এবং ঐক্যের, এই তিন চ্যালেঞ্জে জাসাস পাস করতে পারে কি না, তার ওপরেই নির্ভর করছে জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক ধারার ভবিষ্যৎ।