জাতীয় নিরাপত্তা একটি দেশের প্রধান রক্ষাকবচ। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা দুটোই অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বৈশ্বিক নিরাপত্তা নির্ভর করে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার উপর। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা অনেকটা স্বপ্নের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘর থেকে বের হয়ে কাজ শেষ করে সুরক্ষিত অবস্থায় আবার ঘরে ফেরা যেন একটা যুদ্ধজয় করার মতো অবস্থা। পৃথিবীর অনেক দেশই নাগরিকদের জন্য শতভাগ নিরাপদ। তারা পারলে আমরা পারছি না কেন? আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তর বা সবদিক থেকে আমরা অনৈতিকতার বেড়াজালে আবৃত, আশ্চর্যের বিষয় হলো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও অনৈতিকতা থেকে বাদ যাচ্ছে না! শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে নৈতিক শিক্ষা প্রায় বিলুপ্ত।
প্রথমেই আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার কারণ খোঁজা দরকার—
১. নিরাপত্তা বাহিনীর অপ্রতুলতা: এলাকাভেদে ৩ থেকে ৫ লাখ মানুষের বিপরীতে ৫০ থেকে ১০০ জন পুলিশ কাজ করে
২. ডাকাত-সন্ত্রাসীদের কাছে বিপুল অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ রয়েছে
৩. সারাদেশে একসাথে নিরাপত্তা বাহিনীর টহল বা তদারকি করতে না পারা
৪. অপরাধের তথ্য সংগ্রহের সঠিক (আগাম) ব্যবস্থা না থাকা
৫. প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাথে থানার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়া
৬. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পর্যাপ্ত পরিবহন ব্যবস্থা না থাকা
৭. সময়মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাজির হতে না পারা
৮. বাহিনীর আপসকামিতা, দৃঢ় মনোবল ও ন্যায়নিষ্ঠার অভাব
৯. জুলাই, ২০২৪-এর ঘটনায় পুলিশসহ সব নিরাপত্তা বাহিনী নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে, ইত্যাদি।
সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সুদৃঢ় করার একটি প্রচেষ্টা গড়া সম্ভব—
বিভিন্ন বাহিনী থেকে অবসর নেওয়া হাজার হাজার অফিসার ও লাখ লাখ সৈনিক দেশের প্রতিটি প্রান্তেই আছেন, তাদের সহায়তায় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা অনেকাংশে নিশ্চিত করা সম্ভব। যেমন—দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে/ওয়ার্ডে অবসরপ্রাপ্ত অফিসার, সৈনিক ও শিক্ষিত বেকার যুবকদের সমন্বয়ে একটি করে ‘সামাজিক সুরক্ষা কমিটি’ গঠন করা করে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সম্ভব। একটি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত হবে এই কমিটি। উল্লেখ্য যে এটি কোনো বাহিনী নয়, কমিটি হবে ১১ সদস্য বিশিষ্ট। প্রতিটি কমিটিতে অবসরপ্রাপ্ত ‘স্থানীয়’ ১ জন (অবসরপ্রাপ্ত) অফিসার, ৫ জন (অবসরপ্রাপ্ত) সৈনিক ও ৫ জন শিক্ষিত যুবক থাকবেন, কমিটির সবাই স্থানীয় নাগরিক হলে ইউনিয়নের সব মানুষকে চিনবেন, ফলে তথ্য সংগ্রহ ও আসামি শনাক্ত করা সহজ হবে। সৈনিকদের সব ধরনের প্রশিক্ষণ আছে, তারা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সক্ষম।
অন্যদিকে যুবকদেরকে সৈনিকরাই প্রশিক্ষণ দিতে পারবেন। এই কমিটি থানার সহায়ক হিসেবে কাজ করবে, কমিটির মূল কাজ হবে তৃণমূল পর্যায়ে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়মিত টহল, পরিস্থিতি তদারকি ও তথ্য সংগ্রহ করা, সংগৃহীত সব তথ্য অ্যাপ-এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট থানার ওসি ও ইউএনওসহ এসপি, ডিসি, আইজিকে অবহিত করবেন (অ্যাপ তৈরি করতে হবে)। কমিটির গ্রেপ্তারি ক্ষমতা থাকবে, অতি প্রয়োজনে থানার অনুমতিক্রমে গ্রেপ্তার করতে পারবে, অবৈধ অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য উদ্ধার করতে পারবে, গ্রেপ্তারের পর অস্ত্র বা মাদকদ্রব্য উদ্ধারের পর আসামিকে বা উদ্ধারকৃত বস্তু থানায় সোপর্দ করবে, সংশ্লিষ্ট থানা আসামি বা উক্ত বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নিবে। কমিটির প্রত্যেককে মাসিক ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা ভাতা দেয়া হবে, দেশব্যাপী এই কমিটি পরিচালনায় মাসিক খরচ হবে ৭৫ থেকে ৮০ কোটি টাকা যা আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা বা উন্নয়ন সহযোগীদের থেকেই সংগ্রহ করা সম্ভব বলে মনে করি। আর না পাওয়া গেলে দেশের প্রয়োজনে সরকার নিজেই খরচ করবে।
এই পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলার দ্রুত উন্নতি হবে, অপরাধ প্রবণতাও হ্রাস পাবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৬ মাস অন্তর অন্তর নতুন করে কমিটি গঠন করার প্রয়োজন হতে পারে। প্রশ্ন হলো এই উদ্যোগ নেবেন কে? প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী পরিষদের সম্মিলিত হস্তক্ষেপ ছাড়া এই ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন দুঃস্বপ্ন।
লেখা
মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম
লেখক, গবেষক ও সমাজকর্মী