দুটি সংবাদ। দুটিই অস্বস্তিকর। এক, সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের রেড টেলিফোনের তার কেটে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। বিটিসিএল সারাদিনের চেষ্টায় আবার সেটি সচল করেছে। দ্বিতীয় খবর হচ্ছে, হাসিনাপন্থী সাংবাদিক পান্নার ইউটিউব চ্যানেলে গিয়ে আরেক বিতর্কিত সাংবাদিক সালাহউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রাণনাশের চেষ্টা করা হচ্ছে। দুটো খবরই আমাদের দেশের স্থিতিশীলতার জন্য অ্যালার্মিং।
সবাই বলে সচিবালয় সুরক্ষিত স্থাপনা। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা বলে, সচিবালয় বিন্দুমাত্রও কোনো সুরক্ষিত জায়গা নয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সচিবালয়ে আগুন লেগে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অনেক নথি পুড়ে যাওয়ার কথা নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে। আমি ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত নিয়মিত সচিবালয়ে গিয়েছি। যুগান্তরের উপসম্পাদক বি এম জাহাঙ্গীর আর আমার কাজ ছিল বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে গিয়ে চোথা সংগ্রহ করা। তখন আমরা দেখেছি, সচিবালয় কত ঝুঁকিপূর্ণ।
তবে তখন কোনো প্রধানমন্ত্রী এভাবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মতো সচিবালয়ে নিত্য অফিস করতেন না। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর প্রথম দিন থেকেই যেহেতু সচিবালয়ে অফিস করেন, তাই তার লাল টেলিফোন নিয়ে এমন ষড়যন্ত্র কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। দায়িত্বে গাফিলতির সঙ্গে জড়িত সবার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে যেকোনো শিথিলতা হিতে বিপরীত হবে।
দুই
এবার আসি সালাহউদ্দিন শোয়েব চৌধুরীর কথায়। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার হুমকি আছে। সেটা কতটা আছে কিংবা নেই, সেটাকে সিরিয়াসলি নেওয়ার আগে আসুন জেনে নিই তিনি কে। তার সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৯৭ সালে। সেই সময় তার ইনকিলাব সম্পাদক বাহাউদ্দীন চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল। তিনি ইনকিলাব প্লাস নামে একটি টিভি আনার স্বপ্ন দেখছিলেন। আমি একসময় ইনকিলাবের সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন পূর্ণিমায় লিখতাম। কবি আতাহার খান আমাকে সুযোগ দিয়েছিলেন। তখন অভিনেতা মাহফুজ আহমেদ ও আমার প্রিয়জন ইরাজ আহমেদও পূর্ণিমার নিয়মিত লেখক ছিলেন। তখন বিচিত্রার বিকল্প হিসেবে সবাই পূর্ণিমাকে দেখত।
যদিও আমি দৈনিক বাংলার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক হওয়ার সুবাদে বিচিত্রাতেও কাজ করেছি। সে যাই হোক, বলছিলাম সালাহউদ্দিন শোয়েবের কথা। একদিন ইনকিলাবের প্রধান প্রতিবেদক প্রয়াত মঞ্জু ভাই আমাকে জানালেন, ইনকিলাব টেলিভিশন আনছে, সালাহউদ্দিন শোয়েব দায়িত্বে—তুমি ওর সঙ্গে দেখা করো।
এরপর আমি সালাহউদ্দিন শোয়েবের সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ-খবর নিই। পরে তার সঙ্গে যোগাযোগের আর ইচ্ছে জাগেনি। শোয়েব ব্লিট নামে একটি ম্যাগাজিন বের করতেন। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে তার ভালো যোগাযোগ—এমন অভিযোগও ছিল। শেখ হাসিনার আমলে তিনি একবার বিমানবন্দর থেকে ডিপোর্টও হয়েছিলেন। এরকম একজন ব্যক্তির সঙ্গে হাসিনা-ঘনিষ্ঠ পান্নার টকশো দেখে মনে হলো, এরা প্রয়োজনে ধর্মেও থাকে, জিরাফেও।
তিন
এনটিভিতে আমার এক সহকর্মীকে দেখতাম, সেই সময় শাহবাগে হাসিনাবিরোধী যেকোনো নির্দোষ প্রোগ্রাম—যেমন মানববন্ধন, পদযাত্রা—এ ধরনের ইনোসেন্ট প্রোগ্রামে অফিস ফাঁকি দিয়ে উপস্থিত হতো। পরে সেই নিউজ করানোর জন্য আমাদের অনুরোধ করত। আমরা ব্যাপারটা তখনো বুঝিনি। মনে করেছিলাম, তিনি জেনুইন হাসিনা রেজিমের সমালোচক। পরে জানলাম, তিনি এসব সংগ্রহ করে নিজেকে হাসিনা-রেজিমের বড় ধরনের অ্যাকটিভিস্ট প্রমাণ করে ঠিকই আমেরিকা পাড়ি দিয়েছেন। পরে আমেরিকা থেকে ফোন করে খোঁজ নিতেন—ভাই কেমন আছেন, আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ—ইত্যাদি। আর আমি মনে মনে হাসতাম।
চার
এই সুযোগসন্ধানী একটি গোষ্ঠী ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর ফের দেশে এসেছে, যারা উন্নত ক্যারিয়ারের চিন্তায় দেশ ছেড়েছিল। আমাদের মতো প্রতিদিন কচুক্ষেতে হাজিরা দিতে হতো না তাদের। কারণ দেশে তারা হাসিনাবিরোধী কোনো ভূমিকাই রাখেনি; তারা কেবল জানত, এ দেশে বাস করা নিরাপদ নয়। হাসিনা একজন পারভার্টেড নারী।
সেই সব সুযোগসন্ধানী ৫ আগস্টের পর দেশে এসে অন্তর্বর্তী সরকারের মাথার ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে কিছু সুবিধাজনক পদ বাগিয়ে নিয়েছে। যেমন মনির হায়দার। এক আলী রিয়াজ স্যারের বদান্যতায় তিনি হয়ে গিয়েছিলেন প্রধান উপদেষ্টার রাজনৈতিক উপদেষ্টা। তার গত ১৭ বছরে কী কন্ট্রিবিউশন ছিল, একমাত্র ভার্চুয়াল টকশো ছাড়া?
তিনি আমাকেও বহুবার বলেছেন, তার সঙ্গে ভার্চুয়াল টকশোতে যোগ দিতে। আমি প্রতিবারই বিনয়ের সঙ্গে না বলেছি। যাই হোক, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কোনো পদ-পদবি না পাওয়া অনেক সাংবাদিক, ইনফ্লুয়েন্সার ঘুরছে, যাদের গত ১৭ বছরে কোনো স্ট্রাগল নেই। মার্কিন মুল্লুকে বউ-বাচ্চা রেখে এসেছেন। লাইফটা এনজয় করে এখন তারেক রহমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদ চাইছেন। আমি জানি না তারেক রহমান সরকার কী করবেন। শুধু বলব, নিজের লোকদের চিনুন। কারণ সরকারের পাঁচ বছরের এখনো ছয় মাস হয়নি, একটু একটু করে কিন্তু রিভিল হচ্ছে। সুতরাং...
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক