জাতীয় প্রেসক্লাবে বিপুল সংখ্যক ব্যক্তিকে সদস্য পদ প্রদানের ক্ষেত্রে দলীয় প্রভাব ও প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়টি নিয়ে নবীন-প্রবীণ সাংবাদিকরা সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন প্লাটফর্মে ব্যাপক আলোচনায় লিপ্ত হচ্ছেন। এছাড়া গণমাধ্যম অঙ্গনেও তীব্র ক্ষোভ-বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
প্রবীণ সাংবাদিক হেলাল উদ্দিন ফেসবুকে লিখেছেন, প্রেসক্লাবে কারা ঢুকছে? জাতীয় প্রেসক্লাব কি এখনও সাংবাদিকদের প্রতিষ্ঠান, নাকি এটি এখন রাজনৈতিক আনুগত্য যাচাইয়ের এক অভিজাত ক্লাবে পরিণত হয়েছে? গত ১২ মে জাতীয় প্রেসক্লাব ৪৪১ জন নতুন সদস্যের যে তালিকা প্রকাশ করেছে, সেটি ঘিরে এখন পুরো গণমাধ্যম অঙ্গনে তীব্র প্রশ্ন, ক্ষোভ ও বিতর্ক। বলা হয়েছে ‘দীর্ঘ যাচাই-বাছাই’ শেষে সদস্যপদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই যাচাইয়ের মানদণ্ড কী ছিল—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
দেশের বহু প্রবীণ সাংবাদিক আছেন, যারা ৩০-৪০ বছর ধরে মাঠে-ঘাটে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাংবাদিকতা করেছেন। কেউ জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক, কেউ বার্তা সম্পাদক, কেউ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পরিচিত মুখ।
টিয়ারগ্যাস, হামলা-মামলা, রাজনৈতিক চাপ, সেন্সরশিপ—সবকিছু মোকাবিলা করে তারা সারাজীবন গণমাধ্যমকে দিয়েছেন। অথচ বছরের পর বছর আবেদন করেও তারা জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য হতে পারেননি। তাদের ফাইল পড়ে আছে ধুলোর নিচে।
অন্যদিকে, নামসর্বস্ব অনলাইন, ভুঁইফোঁড় পত্রিকা, রাজনৈতিক পরিচয়ভিত্তিক তথাকথিত সাংবাদিক, সরকারি তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পিআরও, এমনকি সরাসরি দলীয় তদবিরবাজরাও দল বেঁধে সদস্য হয়ে যাচ্ছেন!
জুনিয়ররা সদস্য হচ্ছেন, সিনিয়ররা বাদ পড়ছেন। তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—সদস্যপদের মাপকাঠি কী? সাংবাদিকতা? যোগ্যতা? সংবাদকর্মে অবদান?
নাকি রাজনৈতিক আনুগত্য? আজ বাস্তবতা হলো, আপনি যদি আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা জামায়াত ঘরানার কোনো বলয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলে আপনার জন্য প্রেসক্লাবের দরজা খোলা।
কিন্তু আপনি যদি স্বাধীনচেতা, নিরপেক্ষ ও পেশাদার সাংবাদিক হন, তাহলে আপনি এখানে ‘অপ্রয়োজনীয়’।
সব সরকারই প্রেসক্লাবকে নিজেদের প্রভাব বলয়ের অংশ বানাতে চেয়েছে। আগে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ ছিল অঘোষিত সদস্যপদের শর্ত, এখন ‘জাতীয়তাবাদী’ বা ‘বিপ্লবী’ পরিচয়। সাইনবোর্ড বদলেছে, কিন্তু সংস্কৃতি বদলায়নি।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো—প্রকৃত সাংবাদিকদের অপমানিত ও কোণঠাসা করা হচ্ছে, আর অপসাংবাদিকতা, তোষামোদ ও রাজনৈতিক দালালিকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। এতে শুধু কিছু ব্যক্তি নয়, পুরো সাংবাদিক সমাজের মর্যাদা ধ্বংস হচ্ছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সদস্যপদ প্রক্রিয়াকে অনেকে আগামী প্রেসক্লাব নির্বাচনের ‘ভোট ব্যাংক তৈরির প্রকল্প’ হিসেবে দেখছেন।
কারণ প্রতিটি প্যানেলই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে অনুগত ভোটার বাড়াতে চায়। সেই খেলায় স্বাধীন সাংবাদিকরা সবচেয়ে বড় বাধা।
তাই তাদের আবেদন বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, আর রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্টরা রাতারাতি ভিআইপি সদস্য হয়ে যায়।
জাতীয় প্রেসক্লাব কোনো রাজনৈতিক দলের পকেট সংগঠন হতে পারে না। এটি সাংবাদিকদের প্রতিষ্ঠান।
তাই এখনই সদস্যপদ প্রদানের পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে হবে। ভুয়া সাংবাদিক, রাজনৈতিক ক্যাডার, সুবিধাবাদী আমলা ও তদবিরবাজদের প্রভাবমুক্ত করে মাঠের প্রকৃত সাংবাদিকদের তাদের প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দিতে হবে। নইলে মানুষ একদিন সত্যিই প্রশ্ন করবে—এটি কি জাতীয় প্রেসক্লাব, নাকি রাজনৈতিক ক্যাডার পুনর্বাসন কেন্দ্র?
সাংবাদিক গাজী আবু বাকার লিখেছেন, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্যপদের যোগ্যতা কি সাংবাদিকতা নাকি রাজনৈতিক পরিচয়? জাতীয় প্রেস ক্লাবের গঠনতন্ত্রের প্রস্তাবনার ৩-এর ‘ক’ ধারায় বলা হয়েছে, ‘সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক রুচির উন্নয়ন ও চর্চা এবং তাঁদের সাহিত্য ও শিল্প প্রতিভার বিকাশ ও উন্নয়নে সাহায্য করা।’ ‘খ’ ধারায় বলা হয়েছে, ‘সুস্থ সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের উন্নয়ন এবং ঐতিহ্য গড়ে তোলা।’
আবার সদস্যপদ প্রাপ্তির যোগ্যতা সম্পর্কে অনুচ্ছেদ ২-এর ‘ক’-তে স্থায়ী সদস্যপদ সম্পর্কে বলা হয়েছে—‘সম্পাদক এবং কর্মরত সাংবাদিক, অর্থাৎ সেই সব সাংবাদিক যারা সংবাদপত্র, সংবাদ সংস্থা, বেসরকারি বেতার, টেলিভিশন ও নিবন্ধিত অনলাইন নিউজপোর্টালে এক বছর কিংবা তারও বেশি সময় ধরে কর্মরত রয়েছেন এবং সাংবাদিকতাই যাদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উৎস... স্থায়ী সব সদস্যই হবেন বাংলাদেশের নাগরিক।’
উপ-কমিটির সুপারিশকৃত সদস্য পদে আবেদনকারী সব প্রার্থীকে ব্যবস্থাপনা কমিটি অস্থায়ীভাবে এক বছরের জন্য সদস্য পদ মঞ্জুর করতে পারেন এবং সেই এক বছর তারা পর্যবেক্ষণাধীনে থাকবেন। তার এই অস্থায়ী সদস্যপদের কার্যকালের মেয়াদ এক বছর উত্তীর্ণ হয়ে গেলে এবং ব্যবস্থাপনা কমিটি যদি তার সদস্যপদ খারিজ না করেন, তাহলে তিনি ক্লাবের একজন স্থায়ী সদস্যে পরিণত হবেন।’
এই যখন গঠনতন্ত্রের নির্দেশ, তখন প্রশ্ন জাগে—প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারকরা কি আদৌ এই মর্মকথা ধারণ ও পালন করছেন?
আমার ৪১ বছরের সাংবাদিকতার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আজ এক অনুজপ্রতিম সহকর্মীর সাথে আলাপচারিতায় এক তিক্ত সত্য নতুন করে উপলব্ধি করলাম। মনে হলো, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্যপদ প্রাপ্তি যেন আজ সাংবাদিকতার পেশাদারিত্বের চেয়ে দলীয় আনুগত্যের নিগড়ে বেশি বন্দি।
রাজনীতির শৃঙ্খলে আটকা মেধা
আমার সেই ছোট ভাইটি অত্যন্ত মেধাবী এবং নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিক, যিনি এ পর্যন্ত তিনবার সদস্যপদের জন্য আবেদন করেও ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি আক্ষেপ করে বললেন, ক্লাবের এক প্রভাবশালী নেতার কাছে জানতে পেরেছেন, তার ব্যর্থতার মূল কারণ হলো, ‘তার রাজনৈতিক পরিচয়’ স্পষ্ট না হওয়া। অথচ ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ করার পরেও ক্লাবের আগের কমিটিগুলো তাকে সদস্যপদ দেয়নি। তার প্রশ্নটি আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—‘একজন পেশাদার সাংবাদিকের অধিকার কি তবে চিরকালই রাজনৈতিক পরিচয়ের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকবে?’
আমার অভিজ্ঞতার দর্পণ
নিজের কথা বলতে গেলে, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে আমি দৈনিক ‘আজকের কাগজ’—এর মতো মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের পত্রিকায় কাজ করেছি; আবার কাজ করেছি বিএনপি দলীয় মুখপাত্র দৈনিক ‘দিনকাল’-এও। দীর্ঘ কর্মজীবনে আমি আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, বামপন্থীসহ নানা আদর্শের রাজনৈতিক দলের বিট কাভার করেছি। ১৯৯২ সালে অধ্যাপক গোলাম আযমের সাড়া জাগানো সাক্ষাৎকারটি তৎকালীন বহুল আলোচিত সাপ্তাহিক ‘বিচিন্তা’য় প্রকাশের দায়ে আমাকে ‘জামাতের এজেন্ট’ তকমা পেতে হয়েছিল, হারাতে হয়েছিল ‘আজকের কাগজ’-এর চাকরি। পরবর্তীতে ১৯৯৬-৯৮ সালে কর্নেল ফারুক, কর্নেল হামিদ ও জেনারেল শফিউল্লাহর মতো ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকারও নিয়েছি পেশাদারিত্বের সাথে। আমি গর্বের সাথে বলতে পারি, সাংবাদিকতা জীবনে আমি কখনোই কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করিনি। কোনো অন্ধ আনুগত্য আমাকে আমার পেশা থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। আমার আদর্শিক অবস্থান পরিষ্কার—আমি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং বাহাত্তরের সংবিধানকে আজীবন পরম শ্রদ্ধায় লালন করি। কিন্তু কোনো দলের দালালি না করার মাশুল হিসেবে আমি জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্যপদের জন্য ১১ বার আবেদন করেও আমার প্রাপ্য অধিকার থেকে আজও আমি বঞ্চিত।
কবি শামসুর রাহমানের দীর্ঘ ছায়া
ছোট ভাইটির সাথে আলোচনার পর নতুন করে এই আত্মোপলব্ধিই হলো যে, অন্ধ দলীয় সমর্থক না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য হওয়া হয়তো আমার ভাগ্যে নেই। তবে আমার মনে এক অমোঘ সান্ত্বনা কাজ করে—বাংলাদেশের প্রধানতম কবি ও দৈনিক বাংলার দীর্ঘকালীন সম্পাদক শামসুর রাহমানও কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি না করার মাশুল দিয়েছিলেন। তিনিও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্যপদ পাননি। জাতীয় প্রেসক্লাবে ১৯৯১ সালে জাতীয় কবিতা পরিষদের এক সংবাদ সম্মেলনে আমি নিজে কবি শামসুর রাহমানকে প্রসঙ্গক্রমে প্রশ্ন করেছিলাম যে, দৈনিক বাংলার সম্পাদক হয়েও কেন তিনি জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্যপদ পাননি? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, আজকের সাংবাদিক সম্মেলনের বিষয় বস্তু তো এটা নয়। তারপরও বলছি, ‘কোন রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, আর তাই আমি জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্যপদ পাইনি। এ নিয়ে আমার মধ্যে কোন আক্ষেপ নেই।’
আজ সেই মহান কবির সারিতে নিজের নাম খুঁজে পাওয়াটাই হয়তো আমার জন্য এক অনন্য অহংকার। সদস্যপদ না পাওয়ার বেদনা আমার সাংবাদিকতার সততাকে স্পর্শ করতে পারে না। আমি একজন স্বাধীন সাংবাদিক—এই পরিচয়টুকু নিয়েই আমি সসম্মানে বিদায় নিতে চাই।
প্রবীণ সাংবাদিক আশরাফুল ইসলাম লিখেছেন, অতীতে যারা বাপ-দাদার সম্পত্তি বানিয়েছিল তারা এখন কোথায়? আবার এখন যারা ঘর-বাড়ি বানিয়ে ফেলেছেন তাদের একই পরিণতি হবে ইনশাআল্লাহ। অতীত থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।
দৈনিক আগামী সময়ের সাংবাদিক মাহবুব আলম লাবলুও জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য পদ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্ট্যাটাস দিয়েছেন।