ভারতের সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন এবং সর্বশেষ লোকসভা নির্বাচনের ফল দেশটির রাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। সেটি হলো হিন্দু ও মুসলিম ভোটারদের রাজনৈতিক অবস্থান ক্রমেই দুই ভিন্ন মেরুতে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। একদিকে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি বড় অংশের হিন্দু ভোটকে নিজেদের দিকে টেনে আনতে সক্ষম হয়েছে, অন্যদিকে মুসলিম ভোটারদের বড় অংশ ঝুঁকছে কংগ্রেস ও আঞ্চলিক বিরোধী দলগুলোর দিকে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচয়ের প্রভাব আগেও ছিল, তবে এখন সেটি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান ও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও কেরালার নির্বাচনী ফল বিশ্লেষণ করলে এই প্রবণতা স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিনের তৃণমূল শাসনের পর বিজেপির উত্থান শুধু রাজনৈতিক পালাবদল নয়, বরং ভারতের পূর্বাঞ্চলের রাজনীতিতেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই উত্থানের পেছনে বহু বছর ধরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের সাংগঠনিক কাজ বড় ভূমিকা রেখেছে।
বিভিন্ন জরিপ ও নির্বাচনী তথ্য বলছে, হিন্দু ভোটের বড় অংশ এখন বিজেপির দিকে আরও সুসংগঠিতভাবে ঝুঁকছে। বিশেষ করে উত্তর ও পশ্চিম ভারতে বিজেপির মূল শক্তি হয়ে উঠেছে উচ্চবর্ণ হিন্দু, শহুরে মধ্যবিত্ত, ব্যবসায়ী শ্রেণি এবং হিন্দুত্ববাদে প্রভাবিত তরুণ ভোটাররা। অন্যদিকে মুসলিম ভোটারদের বড় অংশ বিজেপিবিরোধী প্রার্থীর পক্ষে কৌশলগত ভোট দিচ্ছেন, যাতে বিজেপিকে হারানো যায়।
ভারতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান লোকনীতি-সিএসডিএস-এর বিভিন্ন নির্বাচনী জরিপ অনুযায়ী, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে হিন্দু ভোটের প্রায় ৩৪ শতাংশ বিজেপির পক্ষে যায়। ২০১৯ সালে সেটি বেড়ে প্রায় ৪৪ শতাংশে পৌঁছায়। একই সময়ে মুসলিম ভোটের মাত্র ৮ থেকে ৯ শতাংশ বিজেপির পক্ষে ছিল। ২০২৪ সালের নির্বাচনী বিশ্লেষণেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। অনেক রাজ্যে মুসলিম ভোটারদের বড় অংশ এককভাবে বিজেপিবিরোধী প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিয়েছেন।
ভারতের রাজনীতিতে এই ধর্মভিত্তিক মেরুকরণ হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতায় আসার পর হিন্দুত্ববাদ বা হিন্দু জাতীয়তাবাদ ধীরে ধীরে দেশটির রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে ওঠে। গরু রক্ষা আইন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল, অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণ, এমন একাধিক ইস্যু বিজেপিকে হিন্দু ভোটের বড় প্ল্যাটফর্মে পরিণত করেছে। একইসঙ্গে মুসলিমদের একটি অংশের মধ্যে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক অনিরাপত্তা ও বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি।
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিজেপির প্রচারণায় সীমান্ত, অনুপ্রবেশ, জাতীয় নিরাপত্তা ও ধর্মীয় পরিচয় বড় ইস্যু হয়ে ওঠে। নির্বাচনী প্রচারণায় বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের প্রসঙ্গ বারবার সামনে আনা হয়। বিজেপির শীর্ষ নেতারা দাবি করেন, সীমান্ত সুরক্ষা ও জনসংখ্যাগত পরিবর্তন ঠেকাতে শক্ত অবস্থান প্রয়োজন। এর বিপরীতে মুসলিম ভোটের বড় অংশ তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে একাট্টা হয়।
আসামেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। সেখানে কংগ্রেসের জেতা বহু আসনে মুসলিম প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুসলিম ভোটাররা এখন এমন দল খুঁজছেন যারা বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মোকাবিলা করতে পারবে। ফলে ছোট ছোট মুসলিমভিত্তিক দলগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে, আর কংগ্রেস ও আঞ্চলিক বড় দলগুলো মুসলিম ভোটের প্রধান আশ্রয় হয়ে উঠছে।
কেরালাতেও সংখ্যালঘু মুসলিম ও খ্রিস্টান ভোটের বড় অংশ ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের দিকে ঝুঁকেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির উত্থান নিয়ে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে নির্বাচনে।
ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে ধর্মীয় মেরুকরণের প্রভাব সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে। লোকসভায় মুসলিম প্রতিনিধিত্ব গত এক দশকে ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মুসলিম সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন ২৩ জন। ২০১৯ সালে সেই সংখ্যা কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ জনে। তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর বর্তমান লোকসভায় মুসলিম সাংসদের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪ জনে। ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ মুসলিম হলেও বর্তমান লোকসভায় তাদের প্রতিনিধিত্ব ৫ শতাংশেরও কম।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সংখ্যাগতভাবে সামান্য ওঠানামা থাকলেও বাস্তবতা হলো, ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠীর তুলনায় তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। বিজেপি অনেক বড় রাজ্যে একজন মুসলিম প্রার্থীও দেয়নি। উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ ও কর্ণাটকের মতো রাজ্যগুলোতে মুসলিম বিধায়কের সংখ্যা আগের তুলনায় কমেছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রায় ৯৬ কোটি ভোটার নিবন্ধিত ছিলেন। ভোট পড়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশের বেশি। বিজেপি এককভাবে প্রায় ২৪ কোটির বেশি ভোট পেয়েছে। কংগ্রেস পেয়েছে প্রায় ১৪ কোটির বেশি ভোট। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটের এই অঙ্কের পেছনে ধর্মীয় মেরুকরণ বড় ভূমিকা রেখেছে।
রাজনৈতিক ভাষায় রিভার্স পোলারাইজেশন বা পাল্টা মেরুকরণের কথাও এখন আলোচনায় এসেছে। অর্থাৎ, একপক্ষ যখন ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে, অন্যপক্ষও নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আরও সংগঠিত হচ্ছে। ফলে ভারতের নির্বাচন শুধু উন্নয়ন, অর্থনীতি বা কর্মসংস্থানের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং ধর্মীয় পরিচয়ও ভোটের বড় নির্ধারক হয়ে উঠছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, ভারতের প্রশাসনিক কাঠামো ও নির্বাচন ব্যবস্থাও ধীরে ধীরে এই মেরুকরণের অংশ হয়ে উঠছে। পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের আগে বহু মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। মানবাধিকারকর্মী ও বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, এসব ঘটনায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
তবে বিজেপির সমর্থকরা দাবি করেন, এটি ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি নয়; বরং জাতীয়তাবাদ বনাম তুষ্টিকরণ রাজনীতির লড়াই। তাদের ভাষ্য, মোদি সরকারের উন্নয়ন, অবকাঠামো, ডিজিটাল অর্থনীতি, কল্যাণমূলক কর্মসূচি ও শক্তিশালী নেতৃত্বের কারণেই মানুষ বিজেপির প্রতি আস্থা রাখছে।
অন্যদিকে সমালোচকদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের মতে, ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে ভারতের বহুত্ববাদী চরিত্র দুর্বল করা হচ্ছে। তারা আশঙ্কা করছেন, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে ভারতের সামাজিক সংহতি ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ভারতের এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু দেশটির ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতেও ভারতের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান সীমান্ত রাজনীতি, অভিবাসন ইস্যু এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো দেশটি কি তার বহু ধর্ম, বহু ভাষা ও বহু সংস্কৃতির রাষ্ট্রীয় চরিত্র ধরে রাখতে পারবে, নাকি রাজনীতি ক্রমেই সংখ্যাগরিষ্ঠ বনাম সংখ্যালঘুর সরল বিভাজনে আটকে যাবে? সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফল অন্তত এটুকু স্পষ্ট করেছে যে, ভারতের গণতন্ত্রে ধর্ম এখন শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়, বরং সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিচয়গুলোর একটি হয়ে উঠছে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট, সমালোচক
ইমেইল: [email protected]