আজ বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। আপনি যে খবরটি স্ক্রল করে পেরিয়ে গেছেন সেটি হয়তো সত্য। কিন্তু সেটিই পুরো সত্য এমন নিশ্চয়তা নেই।
একটি পরিচিত দৃশ্য। বিকেলে সামাজিক মাধ্যমে একটি লাইভ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, রাস্তার মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, কাচ ভাঙার শব্দ, মানুষ দৌড়াচ্ছে। কয়েক ঘণ্টা পর অনলাইন পোর্টালের শিরোনাম—‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে, কর্তৃপক্ষের আশ্বাস’। বিস্তারিত প্রতিবেদনে হতাহতের সংখ্যা আছে কিন্তু দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে। পরদিন ছাপা পত্রিকায় ঘটনাটি ছোট একটি কলামে, ছবিহীন। তথ্য একই। তবু অভিজ্ঞতা বদলে যায়। কারণ, যে তথ্যটি সামনে থাকে, সেটিই বাস্তবতা হয়ে ওঠে।
সংবাদ তাই কেবল তথ্য নয়, এটি নির্বাচন। আর নির্বাচন মানেই ক্ষমতা। আধুনিক গণমাধ্যম অ্যাটেনশন ইকোনমিতে কাজ করে, এখানে পণ্য হলো আপনার মনোযোগ। ফলে সত্যের ওজন মাপা হয় না তার গুরুত্বে, বরং কতক্ষণ তা আপনাকে ধরে রাখতে পারে, তাতে। অ্যালগরিদম তখন সেই কনটেন্টই সামনে আনে, যা আপনার আগ্রহের সঙ্গে মেলে। আপনি পুরোটা দেখেন না, আপনাকে যা দেখানো হয় সেটুকুই দেখেন।
এখানেই আজকের সংকট। সরাসরি সেন্সরশিপ নয়, বাছাই। সত্যকে সরানো হয় না, ক্রম ঠিক করা হয়।
একসময় প্রশ্ন ছিল—সত্য বলা যাবে কি? এখন প্রশ্ন—কোন সত্যটি আগে দেখানো হবে?
আর যেটি পরে থাকে তা প্রায় অদৃশ্য।
আরেকটি অস্বস্তিকর সত্য আছে—আমরা গণমাধ্যমকে দোষ দিই, কিন্তু নিজের ভূমিকাটি এড়িয়ে যাই। আমরা কী ক্লিক করি, কী শেয়ার করি, কোথায় থামি, এই সিদ্ধান্তগুলোই অ্যালগরিদমকে শেখায়। অর্থাৎ, আমরা শুধু দর্শক নই, আমরাই ফিল্টারকে প্রশিক্ষণ দিই।
তাহলে মুক্ত গণমাধ্যম কী?
এটি শুধু বাধাহীন প্রকাশ নয়, এটি এমন এক পরিবেশ, যেখানে বাছাইয়ের ক্ষমতাও প্রশ্নের মুখে থাকে এবং অপ্রিয় তথ্যও সামনে আসে।
কিন্তু বাস্তবতা অন্যরকম। তথ্যের ভিড়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পিছিয়ে যায়। দ্রুততার চাপে প্রেক্ষাপট হারিয়ে যায়। যা থাকে, তা হলো শব্দ। যা হারায়, তা হলো অর্থ।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে যে প্রশ্নটি এড়ানো যায় না—আপনি কি সত্য জানতে চান, নাকি শুধু সেই খবরটি, যা আপনাকে স্বস্তি দেয়?
কারণ, আপনি যদি বারবার স্বস্তিকেই বেছে নেন, তাহলে পরেরবার যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ সত্য আপনার সামনে আসবে না, সেটি লুকানো হয়নি, আপনিই তাকে সরিয়ে দিয়েছেন।
লেখক: কবি, কথা-সাহিত্যিক