মঙ্গলবার ২৮ এপ্রিল পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোডিং শুরু হচ্ছে। এর মাধ্যমে বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের অভিজাত ক্লাবে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র মূলত ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ প্রক্রিয়ায় কাজ করে। এখানে ইউরেনিয়াম পরমাণুকে নিউট্রন দিয়ে আঘাত করে দ্বিখণ্ডিত করা হয়। এই বিভাজনের ফলে প্রচণ্ড তাপশক্তি উৎপন্ন হয়। সেই তাপ দিয়ে পানি ফুটিয়ে বাষ্প তৈরি করা হয় এবং সেই বাষ্পের চাপে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। সহজভাবে বললে, কয়লা বা গ্যাসে পুড়িয়ে যা করা হয়, এখানে তা করা হয় পরমাণুর বিভাজন থেকে পাওয়া তাপ দিয়ে। মাত্র ১ কেজি ইউরেনিয়াম থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব, তা পেতে প্রায় ৬০ টন উন্নত মানের কয়লা বা আড়াই লাখ লিটার তেলের প্রয়োজন হয়।
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে রাশিয়ার সর্বাধুনিক ‘থ্রি প্লাস (৩+) জেনারেশন’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। নিরাপত্তার জন্য এখানে রয়েছে ‘ফাইভ লেয়ার’ বা পাঁচ স্তরের সুরক্ষা ব্যবস্থা।
যদি কোনো বড় দুর্ঘটনায় চুল্লির ভেতরের জ্বালানি গলে যায়, তবে তা নিচে রাখা একটি বিশেষ পাত্রে (কোর ক্যাচার) জমা হবে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঠান্ডা হয়ে যাবে। এটি মাটির নিচে বা পরিবেশে তেজস্ক্রিয়তা ছড়াতে দেবে না।
প্রকল্প সূত্র জানাচ্ছে, এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লির বাইরের দেয়াল এতই মজবুত যে এটি বড় ধরনের বিমান দুর্ঘটনা বা শক্তিশালী ভূমিকম্প সহ্য করতে সক্ষম। এখানে উৎপাদিত বর্জ্য বা ব্যবহৃত জ্বালানি রাশিয়া ফেরত নিয়ে যাবে, তাই দেশে দীর্ঘমেয়াদী বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি নেই।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট থেকে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। প্রতিটি ইউনিটের ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। এই কেন্দ্রটি যখন পূর্ণ ক্ষমতায় চলবে, তখন দেশের মোট চাহিদার প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ একা এই কেন্দ্র থেকেই সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এটি বেসলোড পাওয়ার প্ল্যান্ট হিসেবে কাজ করবে, অর্থাৎ এখান থেকে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, যা শিল্পায়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
বাণিজ্যিক উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে আগস্ট মাস নাগাদ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে বলে আশা করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। তবে প্রতিটি স্তরে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পৌঁছাতে প্রায় ১০ মাস সময় লেগে যাবে। ধাপে ধাপে সম্পন্ন হওয়া এই বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াটি সফল হলে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পরমাণু শক্তি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিচালনা পর্বে স্থায়ীভাবে প্রবেশ করবে।
বর্তমানে বিশ্বের ৩২টি দেশে ৪৪০টিরও বেশি পারমাণবিক চুল্লি সচল রয়েছে। এই ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উপকারভোগী শীর্ষ দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, চীন, রাশিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়া। দেশগুলো এই প্রযুক্তিতে সবচেয়ে এগিয়ে। ফ্রান্স তাদের মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎই পরমাণু শক্তি থেকে পায়।
প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তান অনেক আগে থেকেই এই প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে আসছে। নতুন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্প্রতি এই তালিকায় যুক্ত হলো।
রূপপুর প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু সস্তা ও কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎই পাবে না, বরং এই উচ্চপ্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে দেশের প্রকৌশলীদের দক্ষতা বৈশ্বিক মানে উন্নীত হবে। এটি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল একটি প্রকল্প। এতে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
বিপুল এই ব্যয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ (১১.৩৮ বিলিয়ন ডলার) ঋণ হিসেবে দিচ্ছে রাশিয়া। বাকি ১০ শতাংশ অর্থায়ন করছে বাংলাদেশ সরকার। রাশিয়ার ঋণের সুদের হার সাধারণত ১.৭৫% (যা ৪ শতাংশের নিচে থাকার কথা)। এই ঋণ ২৮ বছরে পরিশোধ করতে হবে, যেখানে ১০ বছরের গ্রেস পিরিয়ড (কিস্তি শুরু হওয়ার আগের সময়) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই প্রকল্পটি রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পরমাণু সংস্থা রোসাটম নির্মাণ করছে। রোসাটম সরাসরি কত টাকা মুনাফা করবে, তা চুক্তির গোপনীয়তার কারণে প্রকাশ করা হয় না। তবে এই বিশাল বাজেটের বড় অংশই রাশিয়ার প্রযুক্তি, সরঞ্জাম এবং প্রকৌশলীদের পেছনে ব্যয় হচ্ছে। এছাড়া রাশিয়ার জন্য এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত ব্যবসাও এটি।
কেন্দ্রটি চালু হওয়ার পর প্রথম কয়েক বছর রোসাটম এটি পরিচালনা করবে এবং বাংলাদেশি কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেবে। এই রক্ষণাবেক্ষণ এবং খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহের মাধ্যমে তারা দীর্ঘ সময় ধরে একটি নির্দিষ্ট অংকের আয় নিশ্চিত করবে।
রাশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে এই প্রকল্পের জন্য বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত চুক্তি হয়েছে: যেমন, জ্বালানি সরবরাহ চুক্তি। রাশিয়া এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের পুরো আয়ুষ্কাল (৬০ বছর বা তার বেশি) জুড়ে প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়াম জ্বালানি সরবরাহ করবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও চুক্তি হয়েছে। ওই চুক্তিটি এই প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় জ্বালানি বা বর্জ্য রাশিয়া তাদের নিজেদের দেশে ফেরত নিয়ে যাবে। ফলে বাংলাদেশে কোনো পারমাণবিক বর্জ্য থেকে যাওয়ার ভয় নেই।
চুক্তির আওতায় রোসাটম বাংলাদেশি জনবলকে দক্ষ করার জন্য প্রশিক্ষণও দিচ্ছে। রাশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা পারমাণবিক প্রকৌশল বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন।
কেন্দ্রটির কারিগরি কোনো সমস্যা দেখা দিলে বা সংস্কারের প্রয়োজন হলে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞরা তা সমাধান করবেন।
সহজ কথায়, এটি কেবল একটি নির্মাণ চুক্তি নয়; বরং আগামী ৬০ থেকে ৮০ বছরের জন্য রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের একটি গভীর প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব। অনেক বিশেষজ্ঞের ভাষ্যমতে, এতে একদিকে যেমন বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট কাটবে, অন্যদিকে রাশিয়া একটি বড় আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ ও দীর্ঘমেয়াদী আয়ের পথ নিশ্চিত করেছে।
প্রসঙ্গত, ১৯৭৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের নেওয়া প্রাথমিক উদ্যোগকে ৪ দশক পর ২০১০ সালে পুনরুজ্জীবিত করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং রাশিয়ার সাথে চূড়ান্ত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সম্পন্ন করেন। এরপরই এই মেগা প্রজেক্ট নিয়ে কাজ শুরু হয়। অবশেষে এর নির্মাণকাজ প্রতিকূল বিশ্ব পরিস্থিতির মধ্যেও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শেষ করেছে এ সরকার।
আইএইএ-এর কঠোর মানদণ্ড বজায় রেখে সর্বাধুনিক থ্রি-প্লাস প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে ২৮ এপ্রিল ২০২৬ এ প্রকল্পের উদ্বোধন হলো। বাংলাদেশ এখন বিশ্ব পরমাণু ক্লাবের ৩৩তম গৌরবময় সদস্য।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট, সমালোচক
ইমেইল: [email protected]