ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) কেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতির প্রেক্ষাপটে ঢাবি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয় বরং এটি ক্ষমতা, কৌশল ও ন্যারেটিভ নিয়ন্ত্রণের এক জটিল ক্ষেত্র। এখানে যারা নির্বাচিত হন, তারাই আগামী দিনে দেশের রাজনীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করেন বলে ধরে নেওয়া হয়।
এমনকি অনেকের মতে, এখান থেকেই সারা দেশের পলিটিক্যাল ন্যারেটিভ উৎপাদন হয়। ফলে ডাকসু নির্বাচনে জয়ী হওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র সংগঠনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে দাঁড়ায়।
৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ডাকসু-ই ছিল প্রথম কোনো নির্বাচন। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক নির্বাচন হলেও দেশের জনগণের কাছে অনেকটা জাতীয় নির্বাচনের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা দেয়। ফলে এই নির্বাচনে জয় ছাত্র রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর কাছে প্রায় জাতীয় নির্বাচনে জয়ের সমতুল্য গুরুত্ব বহন করে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন কীভাবে জাতীয় রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে ও সারা দেশে ন্যারেটিভ তৈরি করতে সক্ষম হয়, তা আমি পেশাগত কাজের অভিজ্ঞতায় প্রত্যক্ষ করেছি।
ডাকসু নির্বাচনের আগেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যায়, কীভাবে একটি নির্দিষ্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে ন্যারেটিভ নির্মাণ করা হয়। কিছু মোজো সাংবাদিকের মাধ্যমে একজন নারী প্রার্থীকে ঘিরে ব্যক্তিগত কথোপকথন রেকর্ড ও প্রকাশ ও পরে সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংবাদ সম্মেলন বয়কটের আহ্বান—সব মিলিয়ে একটি সুসংগঠিত তথ্যযুদ্ধের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এখানে ঘটনা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সেটির উপস্থাপন। যেহেতু মাঠপর্যায়ের রিপোর্টারদের হাতেই মূলত তথ্য সংগ্রহ ও প্রাথমিক উপস্থাপনার দায়িত্ব থাকে, তাই তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও আদর্শ অনেক সময় গণমাধ্যমের পর্দায় প্রতিফলিত হয়।
এই ধারাবাহিকতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে নির্বাচনের দিন। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থীকে ঘিরে কেন্দ্রে প্রবেশের বিষয়টি হঠাৎ করেই প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়। মিডিয়া এমনভাবে কাভারেজ দেয় যেন সেটিই পুরো নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দু। অথচ গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সেই প্রার্থীর কেন্দ্রে প্রবেশে কোনো বাধা ছিল না। এই মৌলিক তথ্যটি পরিকল্পিতভাবে আড়ালে থেকে যায়।
এখানেই গণমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। তারা শুধু তথ্য পরিবেশন করে না, বরং কোন তথ্য দৃশ্যমান হবে আর কোনটি অদৃশ্য থাকবে, সেটিও নির্ধারণ করে।
একজন সাংবাদিক হিসেবে এই জায়গাটিই সবচেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে। কারণ তথ্য জানা এবং তা প্রকাশ করার মধ্যে অনেক সময় একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়। নির্বাচনের দিন আমি যখন গঠনতান্ত্রিক বাস্তবতার ভিত্তিতে একটি ভিন্ন শিরোনাম করি, তখনই তাৎক্ষণিকভাবে অফিসিয়াল চাপের মুখে পড়তে হয়। কারণ লাইভে প্রায় অধিকাংশ মোজো সাংবাদিকরা বলছে ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী কেন্দ্রে প্রবেশ করে নিয়ম ভেঙ্গেছে, কিন্তু ডাকসুর গঠনতন্ত্রে এ ধরনের কোন কথার উল্লেখ নেই।
এমন প্রচারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রভাবিত হয়ে ভাবতে থাকেন যে, নির্বাচিত হওয়ার আগেই ওই প্রার্থী তার ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করেছেন। ওই সময় আমি একাধিক ভোটারের মতামত নিয়েছিলাম। এ সময় তারা মন্তব্য করেন, নির্বাচিত হওয়ার আগেই যখন একটি ছাত্র সংগঠনের নেতা আচরণবিধি লংঘন করেন নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি আরও ভয়াবহ আচরণবিধি লঙ্ঘন করতে পারেন। ফলে ওই প্রার্থীর ভোটে যে এসব প্রচারণা প্রভাব ফেলেছিল তা স্পষ্ট।
এই অভিজ্ঞতা দেখায়, গণমাধ্যমের ভেতরেও একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ বজায় রাখার প্রবণতা কাজ করে। অন্যদিকে, যখন একটি ইস্যুতে সবার মনোযোগ কেন্দ্রীভূত থাকে, তখন অন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ভিন্ন ধরনের কার্যক্রম চলতে পারে—এই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার্স ক্লাব কেন্দ্র নিয়ে পরে যে প্রশ্ন ওঠে, এবং সেখানে ভোট চলাকালীন ছাত্রশিবিরের আরেকজন ভিপি প্রার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার খবর—এসব বিষয় সেই সন্দেহকে আরও জোরালো করে।
অর্থাৎ দৃশ্যমান বিতর্কের আড়ালে অদৃশ্য কার্যক্রম পরিচালনার কৌশল এখানে কার্যকর হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে ইসলামী ছাত্রশিবির ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলসহ অন্যান্য সংগঠনের ভূমিকা একজন রিপোর্টার হিসাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। কারণ একটি ন্যারেটিভ কখনো এককভাবে তৈরি হয় না, বরং বিভিন্ন পক্ষের সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে তা গড়ে ওঠে।
আগাম তথ্য থাকা সত্ত্বেও সেটিকে প্রতিরোধে রূপ দিতে না পারা যেমন কৌশলগত ব্যর্থতা, তেমনি সেটি অন্য পক্ষের কৌশলগত সাফল্যেরও ইঙ্গিত দেয়। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি লক্ষ্য করা যায় ২০২৪ সালের পর মিডিয়া বাস্তবতায়।
নির্দিষ্ট মতাদর্শভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোর সংগঠিতভাবে গণমাধ্যমে প্রবেশ ও প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। এর ফলে সংবাদ নির্বাচন, শিরোনাম নির্ধারণ ও বিশ্লেষণের দৃষ্টিভঙ্গি, সবকিছুতেই একটি ধারাবাহিক বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দেখা যায়। এটি কেবল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি ন্যারেটিভ নির্মাণ প্রক্রিয়া।
এই বাস্তবতায় সাংবাদিকতার সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। সত্য জানা থাকলেও সেটি সবসময় প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, পেশাগত স্থিতি ও সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা অনেক সময় সাংবাদিককে আত্মসংযমে বাধ্য করে। ফলে গণমাধ্যম, যা মূলত সত্য অনুসন্ধানের জায়গা, সেটিই কখনো কখনো নিয়ন্ত্রিত বয়ানের বাহক হয়ে দাঁড়ায়।
গত বছর ৯ সেপ্টেম্বর ডাকসু নির্বাচন ঘিরে আমার এই অভিজ্ঞতা একটি বড় বাস্তবতাকে সামনে আনে। আজকের রাজনীতি কেবল মাঠে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সমানভাবে পরিচালিত হচ্ছে গণমাধ্যমের ভেতর দিয়ে। এখানে যারা ভোটে এগিয়ে থাকে শুধু তারাই জয়ী নয়। যারা সবচেয়ে দক্ষতার সঙ্গে ন্যারেটিভ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তারাই জয়ী। আর এই ন্যারেটিভের লড়াইয়ে একজন সাংবাদিক অনেক সময় নিজেই হয়ে ওঠেন নীরব সাক্ষী।
লেখক: সাংবাদিক