৫ আগস্ট। আন্দোলনকারীদের ভাষায় ৩৬ জুলাই। আর ১০টা দিনের মতো সেদিনই সূর্য উদয় হয়েছিল স্বাভাবিক নিয়মেই। কিন্তু ৬ জানুয়ারি ২০০৯-এ নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী শাসনের যে সূর্য উদীয় হয়েছিল, তার পতন হয় প্রায় ১৬ বছর পর। সেই দিনের সূর্যের আলো নতুন করে সাক্ষী হয়েছিল বাংলাদেশের ইতিহাস বদলের। কারণ ৫ আগস্ট দেশের মানুষের ওপর গেড়ে বসা প্রায় ১৬ বছরের স্বৈরশাসককে উৎখাত করা হয়।
মার্চ টু ঢাকা: ৬ আগস্টের মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি একদিন এগিয়ে ৫ আগস্টে নেওয়া হয়। ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ তার করা এক অনির্ধারিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, ‘পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এক জরুরি সিদ্ধান্তে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি একদিন এগিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে।’ একই সঙ্গে ৫, ৬ ও ৭ আগস্ট নির্বাহী আদেশে সরকারি ছুটি ঘোষণা করে সরকার।
সময় যত পার হচ্ছে দেশের পরিস্থিতি ততই অবনতির দিকে যাচ্ছে। ছাত্রদের সঙ্গে সাধারণ জনতা রাস্তায় নেমে আসছিল। ঘটনার আঁচ করতে পেরে রোববার সন্ধ্যা ছয়টা থেকেই অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করে সরকার। একই সঙ্গে ৫, ৬ ও ৭ আগস্ট নির্বাহী আদেশে সরকারি ছুটি ঘোষণা করে সরকার। তার আগেই ৪ আগস্টেও সারা দেশে অন্তত ৬৮ জন মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে।
কারফিউ জারির পর রাত থেকেই থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল ঢাকা-সহ গোটা বাংলাদেশে।
পরের দিন বেলা ১১টার দিকে জানা যায়, শেখ হাসিনা গণভবন ছেড়ে গেছেন। সেখান থেকে বাংলাদেশের হেলিকপ্টারে করে ত্রিপুরার আগরতলা পৌঁছান। এরপর ভারতের বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে চেপে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দিল্লি পৌঁছান।
অন্যদিকে, সকাল নয়টার দিকে দেশে ইন্টারনেট সংযোগ দেড় ঘণ্টার মতো বন্ধ করে দেওয়া হয়। শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে ওঠার পর থেকে ইন্টারনেট সংযোগ সচল করা হয়। গণমাধ্যমে উঠে আসে, শেখ হাসিনা সকালে তিন বাহিনীর প্রধান ও পুলিশ প্রধানের সঙ্গে একসঙ্গে বৈঠক করেন গণভবনে। অন্য একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়, নিরাপত্তা বাহিনী কেন পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না, সেটার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘একপর্যায়ে শেখ হাসিনা আইজিপিকে দেখিয়ে বলেন, তারা (পুলিশ) তো ভালো করছে।’ তখন আইজিপি জানান, পরিস্থিতি যে পর্যায়ে গেছে, তাতে পুলিশের পক্ষেও আর বেশি সময় এ রকম কঠোর অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব নয়।
৫ আগস্ট ২০২৪, সকালে গণভবন থেকে কুর্মিটোলা, তারপর বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি পরিবহন বিমানে করে শেখ হাসিনাকে দিল্লির হিন্দন বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। শেখ হাসিনা নিরাপদে দেশ ত্যাগ করার অনেকটা সময় পরে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বিবিসিকে বলেন, তার মা দেশ ছাড়তে চাননি। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা ছিলেন। সে জন্য তাকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার কথা জোর দিয়ে বলেন। তার নিরাপত্তা নিয়ে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন ছিলেন।
দেশ ছাড়ার ঠিক আগেও শেখ হাসিনা শেষবারের মতো সকাল সাড়ে ১০টার মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধানদের ডেকে পাঠান। তারাও শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনায় বসতে চাচ্ছিলেন। শেখ হাসিনা নিরাপত্তা বাহিনীদের প্রতি তাদের ব্যর্থতার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং বিক্ষোভকারীদের প্রতিরোধের নির্দেশ দেন। পরে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়, শেখ হাসিনাকে জানানো হয় রাজধানীর প্রবেশদ্বারে লাখ লাখ মানুষ অবস্থান করছেন।
‘গোয়েন্দা সংস্থার সেই বার্তাই যেন ছিল ১৬ বছরের শাসনের শেষ সংকেত। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিভে যায় দীর্ঘদিনের ক্ষমতার আলো। ইতিহাসের পাতা উল্টে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে জন্ম নেয় নতুন বাংলাদেশের এক নতুন বাস্তবতা।