রক্তাক্ত শাপলা চত্বর
আজ ৫ মে। ২০১৩ সালের এই দিনে মহানবী (সা.) ও পবিত্র কোরআন অবমাননার প্রতিবাদে ১৩ দফা দাবিতে শাপলা চত্বরে সমবেত হয়েছিলেন লাখো আলেম-ওলামা ও মাদ্রাসাছাত্র। কিন্তু গভীর রাতে সেই সমাবেশস্থল পরিণত হয় রণক্ষেত্রে, যার ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ৫ মে দিবাগত রাত সোয়া ১টার দিকে পুরো মতিঝিল এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। ঘুটঘুটে অন্ধকারে চারদিকে যখন আতঙ্ক বিরাজ করছে, তখন পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির শত শত সদস্য তোপখানা মোড়, ফকিরাপুল ও দিলকুশা এলাকা দিয়ে অভিযান শুরু করেন। রাত পৌনে ৩টার দিকে শুরু হয় তাণ্ডব। সাউন্ড গ্রেনেড, কাঁদানে গ্যাস আর শত শত রাউন্ড ফাঁকা গুলির শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
অভিযোগ রয়েছে, ঘুমন্ত মাদ্রাসাছাত্রদের ওপর কোনো আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই এই আক্রমণ চালানো হয়েছিল। ১০ মিনিটের ঝটিকা অভিযানে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে সমাবেশস্থল এবং ভোররাত ৪টা পর্যন্ত চলে চিরুনি তল্লাশি।
সেই রাতে ঠিক কতজন প্রাণ হারিয়েছিলেন, তা নিয়ে এক যুগ ধরে চলছে বিতর্ক। তৎকালীন সরকার দাবি করেছিল যে অভিযানে কেউ নিহত হয়নি, বরং আন্দোলনকারীরা গায়ে রঙ মেখে শুয়ে ছিলেন। তবে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ সে সময় ৬১ জন নিহত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করে। অন্যদিকে বিভিন্ন বিরোধী দল এই সংখ্যা আড়াই হাজার পর্যন্ত হতে পারে বলে দাবি করে আসছিল।
তৎকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে সারাদেশে মোট ২৮ জন নিহতের কথা স্বীকার করেছিল। রক্তক্ষয়ী এ ঘটনাকে আড়াল করতে ৬ মে ভোররাতেই দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল বলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই হত্যাকাণ্ডের বিচারে নতুন মোড় নিয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তে উঠে আসছে সেই রাতের রোমহর্ষক সব তথ্য।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, মামলার তদন্তের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। নারকীয় হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় নিহত ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ঢাকাতেই অন্তত ৩২ জনকে হত্যার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে। পরিকল্পিত এই সহিংসতা ঘিরে হওয়া ঢাকার বাইরের হত্যাকাণ্ডগুলোকেও মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।
সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুসহ ৬ জন বর্তমানে এই মামলায় গ্রেপ্তার রয়েছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, এই মামলায় ঘটনার নির্দেশদাতা রাজনীতিবিদ ও পুলিশ কর্মকর্তাসহ অন্তত ২৫ জনের বেশি আসামি হতে পারে।
অভিযোগ রয়েছে, বিচারের দাবিতে এক যুগ ধরে আকুতি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উল্টো হামলা-মামলার শিকার হতে হয়েছে তাদের।
অবশেষে আগামী ৭ জুনের মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিলের প্রস্তুতি চলছে।