জুলাই গণ-আন্দোলনের পর বদলে যাওয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া হত্যা ও সহিংসতার মামলা। প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বহু সাংবাদিক এখনো কারাগারে রয়ে গেছেন, অথচ অধিকাংশ মামলায় অভিযোগপত্রই জমা হয়নি। বিচার শুরু হয়নি, শেষ হয়নি তদন্তও।
৩ মে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। সাংবাদিকতার স্বাধীনতার মৌলিক নীতিগুলো উদ্যাপন, বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মূল্যায়ন ও পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারানো সাংবাদিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর উদ্দেশ্যে দিবসটি পালিত হয়। তবে বাংলাদেশে এই দিবসটি এমন এক প্রেক্ষাপটে পালিত হচ্ছে যেখানে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিয়ে গভীর উদ্বেগ বিদ্যমান।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ৩৭টি মামলায় ২৬৮ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে। এদের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন অন্তত ১৪ জন।
এসব মামলার বেশিরভাগই জুলাই আন্দোলনের সময়কার সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকেই অভিযুক্ত সাংবাদিকদের ক্ষমতাচ্যূত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘দোসর’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তবে সাংবাদিকদের পরিবার, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগগুলো অস্পষ্ট, আর বিচারিক প্রক্রিয়াও অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ হচ্ছে।
ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত গ্রেপ্তার হন ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। রাজধানীর ভাষানটেক থানার একটি হত্যা মামলায় তাকে আটক করা হয়। একই মামলায় গ্রেপ্তার হন একাত্তর টেলিভিশনের সিইও মোজাম্মেল হক বাবুসহ আরও কয়েকজন।
প্রায় ২০ মাস ধরে কারাগারে থাকা শ্যামল দত্তের পরিবার বলছে, তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো অভিযোগপত্র দাখিল হয়নি। অথচ হার্টের জটিলতা ও স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো গুরুতর শারীরিক সমস্যা থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না।
তার স্ত্রী কণা দত্তের কণ্ঠে তাই হতাশা স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘অন্তত ঈদের আগে হলেও যেন ছেড়ে দেওয়া হয়। মেয়েটা অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করছে, কিন্তু ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ থাকায় টাকা পাঠাতেও পারছি না।’ পরিবারের দাবি, যে ঘটনার মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেসময় তিনি ঢাকাতেই ছিলেন না।
একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক হেড অব নিউজ শাকিল আহমেদ ও সাবেক চিফ করেসপনডেন্ট ফারজানা রূপাকে ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয়। প্রথমে উত্তরা পূর্ব থানার একটি হত্যা মামলায় রিমান্ডে নেওয়া হয় তাদের। পরে আদাবর থানার আরেকটি হত্যা মামলায় নতুন করে রিমান্ড মঞ্জুর হয়। এরপর থেকে একের পর এক মামলায় তারা কারাগারেই আছেন। বর্তমানে তাদের বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় অন্তত ১৫টি হত্যা মামলা রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, অধিকাংশ মামলায় তারা প্রধান আসামিও নন, কারও নাম রয়েছে ৩০ বা ৫০ নম্বরের পরে। তারপরও জামিন মিলছে না।
এক স্বজন বলেন, ‘১৮ মাস হয়ে গেল, এখনো চার্জশিট দেয়নি। কিন্তু জামিনও দিচ্ছে না। এটা এক ধরনের অনিশ্চয়তার কারাগার।’ সাংবাদিকদের আইনজীবীদের অভিযোগ, উচ্চ আদালতে জামিন শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষ বারবার সময় আবেদন করে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ করছে। আবার কোনো মামলায় জামিন মিললেও পরে তা চেম্বার আদালতে স্থগিত হয়ে যাচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলছেন, ‘জুলাই-পরবর্তী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর ধরন প্রায় একই। প্রত্যেক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা। একই ধরনের অভিযোগ। আদালত বদল, শুনানি পেছানো, সব মিলিয়ে এটা একটা দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে এখন বাস্তব শঙ্কা তৈরি হয়েছে।’
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে), আর্টিকেল নাইনটিন ও রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) এসব ঘটনার সমালোচনা করেছে।
সিপিজে সম্প্রতি চার সাংবাদিক, শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল হক বাবু, শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রূপার মুক্তি দাবি করে বিবৃতি দেয়। সেখানে বলা হয়, এখন পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। আরএসএফ সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাব জব্দ ও হত্যা মামলায় জড়ানোর ঘটনাকে উদ্বেগজনক প্রবণতা বলে উল্লেখ করেছে।
মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা বলছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতেই পারে রাষ্ট্র। কিন্তু আইনের প্রয়োগ যেন প্রতিশোধমূলক বা দমনমূলক না হয়। মানবাধিকারকর্মী কাজী জাহেদ ইকবাল বলেন, ‘আইন যেন নিপীড়নের হাতিয়ার না হয়। স্বাধীন মতপ্রকাশ ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্র সংকুচিত হলে সেটা গণতন্ত্রের জন্যও অশনি সংকেত।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো পর্যালোচনার দাবি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছে নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব)। নোয়াব সভাপতি ও মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সরকার এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। আমরা বলেছি, বিনা বিচারে কাউকে এতদিন আটকে রাখা যায় না। প্রধানমন্ত্রী তালিকা চেয়েছেন এবং বিষয়টি পর্যালোচনার আশ্বাস দিয়েছেন।’
তবে সাংবাদিক পরিবারের সদস্যদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই, এই অপেক্ষার শেষ কবে হবে?