অন্ধকার প্রকোষ্ঠের দেয়াল কি জানে সেই আর্তনাদ? ২০১৫ সালের ৩ মে। বিষণ্ণ এক দুপুরে রাজশাহী কারাগারের চার দেয়ালের ভেতর নিভে গিয়েছিল এক উজ্জ্বল রাজনৈতিক নক্ষত্র। তিনি নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু, যিনি রাজপথ কাঁপানো ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি, সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির দুঃসময়ের এক লড়াকু সৈনিক। সোমবার (৩ মে) তার প্রয়াণের ১১ বছর পূর্ণ হলেও, সেই মৃত্যুর রহস্য আজও অন্ধকারেই ঢাকা রয়ে গেছে।
নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর মৃত্যু কি স্বাভাবিক ছিল, নাকি এটি ছিল এক সুপরিকল্পিত ‘স্লো পয়জন’ বা চিকিৎসার নামে অবহেলার শিকার? পরিবারের দাবি, ১১ বছর ধরে একই তপ্ত দীর্ঘশ্বাসে গুমরে মরছে। তার স্ত্রী নাসিমা আক্তার কল্পনা এখনও ডুকরে কেঁদে ওঠেন, ‘আমার স্বামী মারা যাননি, তাকে হত্যা করা হয়েছে।’ ঢাকা থেকে দূরে রাজশাহীতে স্থানান্তর করা কি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল, নাকি সিটি নির্বাচনের আগে এক জনপ্রিয় নেতাকে জনবিচ্ছিন্ন করার নীল নকশা।
উচ্চ আদালতের নির্দেশ ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) পিন্টুর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার। কিন্তু সেই নির্দেশ কি লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে ধামাচাপা পড়ে গিয়েছিল? পিন্টুর ভাই নাসিম আহমেদ রিন্টুর কণ্ঠে আজও সেই আক্ষেপ, একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিও পরিবারের শেষ দেখা পায়, কিন্তু পিন্টু পাননি। অসুস্থ অবস্থায় নারায়ণগঞ্জ থেকে রাজশাহী, আর সেখান থেকে চিরতরের জন্য না ফেরার দেশে।
পিন্টুর মৃত্যুর ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২৭ জনকে আসামি করে মামলা করা হলেও তার কূল-কিনারা হয়নি আজও। পিবিআই তদন্তের দায়িত্ব পেলেও গত এক দশকে মেলেনি কোনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন। এই মামলায় বিবাদী তালিকায় রয়েছেন সাবেক প্রভাবশালী মন্ত্রী ও আমলারা। পরিবারের প্রশ্ন, কবে শেষ হবে এই প্রতীক্ষার প্রহর।
২০০১ সালে লালবাগ-কামরাঙ্গীরচর থেকে নির্বাচিত এই জনপ্রতিনিধি ছিলেন কর্মীদের কাছে সাহসের প্রতীক। পিলখানা হত্যা মামলায় কারাবরণ ও পরে কারাগারেই তার মৃত্যু এক অমীমাংসিত অধ্যায়।
তৎকালীন রাজশাহী কারাগারের ডেপুটি জেলার মিজানুর রহমান জানিয়েছিলেন, পিন্টু দীর্ঘদিনের হৃদরোগী ছিলেন। তবে পরিবারের অভিযোগ, কারাগারে চিকিৎসক ডাকার অনুরোধ উপেক্ষা করা এবং সময়মতো হাসপাতালে না নেওয়াটাই ছিল তার মৃত্যুর প্রধান কারণ।
রাজপথের সেই লড়াকু নেতা আজ মাটির নিচে শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন কি না জানা নেই, তবে তার পরিবারের বিচার পাওয়ার হাহাকার আজও আকাশ-বাতাস ভারী করে তুলছে। ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও পিন্টু হত্যার বিচার কি আদৌ হবে? উত্তরটি সময়ের গর্ভেই রয়ে গেছে।