সাম্প্রতিক সময়ে ধানমন্ডি লেক এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে সাধারণ শিক্ষার্থী, পথচারী ও সাংবাদিকদের ওপর পুলিশের চড়াও হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশেষ করে ডিএমপির রমনা বিভাগের ডিসি মাসুদ আলমের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের লাঠিপেটা এবং মোবাইল ফোন তল্লাশির বিষয়টি নাগরিক অধিকার নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। পুলিশ কি মোবাইল ফোন চেক করতে পারে?
রাস্তায় থামিয়ে সাধারণ মানুষের ফোনের গ্যালারি বা মেসেজ চেক করা বর্তমানে পুলিশের একটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আইনের ভাষায় এটি সম্পূর্ণ বেআইনি।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৩(খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যেক নাগরিকের যোগাযোগ ও চিঠিপত্রের গোপনীয়তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি দেশের নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মূল্য অপরিসীম।
একটি দেশ কতটা সভ্য, পরস্পরের ব্যক্তিগত গোপনীয় সুরক্ষার মাধ্যমে সেটি ফুটে উঠে।
কিন্তু আমাদের দেশে এটি লঙ্ঘন হয় অহরহই। আইনজীবীদের মতে, কোনো সুনির্দিষ্ট মামলা বা আদালতের নির্দেশ ছাড়া পুলিশ কারও ব্যক্তিগত ফোন চেক করতে পারে না।
সাইবার নিরাপত্তা আইন বা অন্য কোনো আইন পুলিশকে এই ‘র্যান্ডম চেক’-এর ক্ষমতাও দেয়নি। এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মারাত্মক লঙ্ঘন।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারা অনুযায়ী, পুলিশ তদন্তের স্বার্থে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। কিন্তু এখানে দুটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—
আত্মপক্ষ সমর্থন: সংবিধানের ৩৫(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কাউকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না। অর্থাৎ, পুলিশ আপনাকে প্রশ্ন করতে পারে, কিন্তু আপনি যদি মনে করেন উত্তরটি আপনাকে কোনো বিপদে ফেলবে, তবে আপনি চুপ থাকার আইনি অধিকার রাখেন।
অহেতুক মন্তব্য: একটি ঘটনায় পুলিশ এক শিক্ষার্থীকে বলেছে, ‘কোনো ভদ্রলোক ইফতারের পর এখানে আসে না’। আইনের দৃষ্টিতে এমন নীতি পুলিশিং বা নৈতিক অবমাননা করার কোনো এখতিয়ার পুলিশের নেই।
তল্লাশি ও সাক্ষীর প্রয়োজনীয়তা ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারা অনুযায়ী, কোনো স্থানে বা ব্যক্তির দেহে তল্লাশি চালাতে হলে স্থানীয় অন্তত দুজন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে সাক্ষী হিসেবে রাখতে হবে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বা অন্যত্র পুলিশ যেটি করে, তারা একাই পকেট বা মানিব্যাগ চেক করে; যা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
৫২ ধারা অনুযায়ী, কোনো নারীকে কেবল নারী পুলিশই তল্লাশি করতে পারবেন। কোনো পুরুষ পুলিশ সদস্যের নারীর দেহ স্পর্শ করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলার পর চার সদস্যকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ঘোষণার পর (যা পরবর্তীতে তিনি কেবল তার নির্বাচনী এলাকার জন্য সীমাবদ্ধ বলে জানিয়েছেন) পুলিশের এই অতি-উৎসাহী ভূমিকা বাহিনীর ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া শিক্ষার্থী বা সাংবাদিকদের ওপর বলপ্রয়োগ সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী।
জনগণের জানমাল রক্ষার পরিবর্তে যদি সাধারণ মানুষই পুলিশের কাছে নিরাপদ বোধ না করেন, তাহলে তা আইনের শাসনের জন্য বড় হুমকি।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনায় অভিযুক্ত চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কেবল বিভাগীয় ব্যবস্থা নয়, বরং দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।