সরি, একটা প্রশ্ন করতে পারি?, সরি, আপনাকে বিরক্ত করলাম, সরি, আমি বুঝতে পারিনি, এমন বাক্য অনেক নারীর দৈনন্দিন কথাবার্তার অংশ। কিন্তু সত্যিই কি নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি ক্ষমা চান? আর যদি চান, তাহলে এর পেছনে কারণ কী?
সিএনএনের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাসের নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক প্রত্যাশা, লিঙ্গভিত্তিক সংস্কৃতি এবং দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের ইতিহাস। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অনেক নারী এমন পরিস্থিতিতেও সরি বলেন, যেখানে বাস্তবে তাদের সরি বলার মতো কোনো দোষই থাকে না।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ায় কর্মরত বিক্রয়কর্মী গ্যাব্রিয়েলা ক্রায়ান সিএনএনকে বলেন, একবার অফিসে সহকর্মীদের জন্য ভুল কফি পৌঁছে গেলে তিনি ক্ষমা চেয়েছিলেন, যদিও ভুলটি করেছিলেন কফি দোকানের কর্মীরা। তার ভাষায়, অনেক সময় এমন ঘটনার জন্যও আমি দুঃখ প্রকাশ করি, যেটা আমার কারণে ঘটেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে মেয়েদের ওপর ছোটবেলা থেকে চাপিয়ে দেওয়া একধরনের সামাজিক প্রত্যাশা। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক স্টিফেন হিনশ বলেন, সমাজ মেয়েদের একই সঙ্গে সহানুভূতিশীল, সফল এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার চাপ দেয়। এই তিন ধরনের প্রত্যাশা একসঙ্গে পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। ফলে অনেক নারী নিজের আচরণ নিয়ে অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে ওঠেন এবং অজান্তেই ক্ষমা চাওয়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে।
হিনশের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদের ‘নিখুঁত’ জীবন দেখে অনেক কিশোরী ও তরুণী নিজেদের নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগেন। এর ফলে আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং অন্যদের বিরক্ত করার ভয় থেকে তারা বেশি বেশি ক্ষমা চাইতে শুরু করেন।
তবে গবেষকরা বলছেন, ব্যাপারটি এতটা সরলও নয় যে পুরুষরা ক্ষমা চান না আর নারীরা চান। পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক মনোবিজ্ঞানী কারিনা শুম্যানের গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষ ও নারী উভয়েই ভুল করলে প্রায় একই হারে ক্ষমা চান। পার্থক্য হলো, কোন আচরণকে ভুল বা অপমানজনক বলে মনে করা হবে, সে বিষয়ে নারীদের সংবেদনশীলতা তুলনামূলক বেশি। ফলে তারা বেশি পরিস্থিতিকে ক্ষমা চাওয়ার উপযুক্ত বলে মনে করেন।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের বাস্তব ও কাল্পনিক বিভিন্ন পরিস্থিতি দেখানো হয়েছিল। সেখানে দেখা যায়, একই ঘটনার ক্ষেত্রে নারীরা সেটিকে বেশি গুরুতর হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন এবং মনে করেছেন, এ জন্য ক্ষমা চাওয়া প্রয়োজন। পুরুষদের ক্ষেত্রে সেই প্রবণতা তুলনামূলক কম ছিল।
কর্মক্ষেত্রেও এর প্রভাব দেখা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশি ক্ষমা চান তাদের সাধারণত বিনয়ী, সহানুভূতিশীল ও আন্তরিক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু একই সঙ্গে তাদের কম দৃঢ়চেতা বা কম কর্তৃত্বপূর্ণ বলেও মনে করা হতে পারে। বিশেষ করে নেতৃত্বের অবস্থানে থাকা নারীদের ক্ষেত্রে এটি কখনও কখনও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানও দেখায়, করপোরেট বিশ্বের শীর্ষ নেতৃত্বে নারীদের উপস্থিতি এখনও সীমিত। ফলে অনেক কর্মক্ষেত্রে নারীরা নিজেদের অবস্থান নিয়ে অতিরিক্ত সতর্ক থাকেন। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এর ফলেও অপ্রয়োজনীয় ক্ষমা চাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা ক্ষমা চাওয়াকে নেতিবাচক কিছু হিসেবে দেখছেন না। তাদের মতে, সত্যিকারের ক্ষমা চাওয়া মানুষের মধ্যে বিশ্বাস ও সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে। সমস্যা হয় তখনই, যখন সরি শব্দটি এত বেশি ব্যবহার করা হয় যে এর প্রকৃত মূল্য কমে যায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারীর আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্ব এবং কর্মক্ষেত্রে সমঅধিকার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সেই আলোচনার মধ্যেই নতুন করে সামনে এসেছে আরেকটি প্রশ্ন, নারীরা কী সত্যিই অতিরিক্ত ক্ষমা চান, নাকি সমাজই তাদের এমন আচরণ করতে শিখিয়েছে?
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, উত্তরটা সম্ভবত মাঝামাঝি কোথাও। মানুষের উচিত প্রতিটি পরিস্থিতিতে নিজেকে প্রশ্ন করা, আমি কি সত্যিই কোনো ভুল করেছি, নাকি শুধুই সামাজিক অভ্যাসের কারণে ক্ষমা চাইছি? কারণ প্রয়োজনের সময় আন্তরিক ক্ষমা চাওয়া যেমন মূল্যবান, তেমনি অপ্রয়োজনীয় ক্ষমা চাওয়া আত্মবিশ্বাসকেও ধসিয়ে দিতে পারে।
সূত্র: সিএনএন, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া ও ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গ