আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মূল ভিত্তি হলো সঠিক রোগ নির্ণয়। রোগ সঠিকভাবে শনাক্ত না হলে উন্নত চিকিৎসাও ব্যর্থ হতে পারে। আর এই নির্ণয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিভিন্ন চিকিৎসা যন্ত্র বা মেডিক্যাল ডিভাইস, যা মূলত নানা ধরনের সেন্সরের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে।
মানুষের শরীরে যেমন তাপ, চাপ, গঠন, গন্ধ বা স্বাদের অনুভূতি গ্রহণের জন্য প্রাকৃতিক ইন্দ্রিয় রয়েছে, তেমনি আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রেও ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন সেন্সর, যেগুলো তাপমাত্রা, চাপ, বৈদ্যুতিক সংকেত, রাসায়নিক উপাদান, চৌম্বক ক্ষেত্র, আলো কিংবা জীববৈজ্ঞানিক পরিবর্তন শনাক্ত করতে সক্ষম। এসব যন্ত্র মানুষের ইন্দ্রিয়ের তুলনায় অধিক নির্ভুলতা ও সূক্ষ্মতার সঙ্গে কাজ করতে পারে।
বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পরিবর্তন নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। অঙ্গের গঠন, অবস্থান ও বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। ফলে রোগ নির্ণয় এখন আর অনুমাননির্ভর নয়; এটি তথ্যনির্ভর, বৈজ্ঞানিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর একটি প্রক্রিয়া।
তবে একটি মেডিকেল ডিভাইসের কার্যকারিতা কেবল তার প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে সঠিক নকশা, মানসম্মত উৎপাদন, কঠোর গুণগত পরীক্ষা, নিরাপদ পরিবহন, ব্যবহারকারীর প্রশিক্ষণ, ফলাফলের যথাযথ ব্যাখ্যা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ। এই পুরো ব্যবস্থাটি একটি সমন্বিত কাঠামো, যেখানে যেকোনো দুর্বলতা চূড়ান্ত ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে অধিকাংশ চিকিৎসা যন্ত্র আমদানি-নির্ভর, সেখানে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও ব্যবস্থাপনাগত নানা সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে যন্ত্র সঠিকভাবে ব্যবহার বা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না, অথবা পরীক্ষার ফলাফল যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা হয় না। এর ফলে ভুল রোগ নির্ণয় ঘটে, যা রোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর।
এই সমস্যা সমাধানে প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা চালুর মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রত্যাশিত ফল এখনো আসেনি, কারণ সমস্যাটি কেবল দক্ষতার নয়; এটি একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ঘাটতি।
এই প্রেক্ষাপটে হাসপাতালগুলোতে ক্লিনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ চালু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে যন্ত্রের নির্বাচন, ইনস্টলেশন, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহারে পেশাদার তদারকি নিশ্চিত করা সম্ভব। পাশাপাশি দেশে মেডিকেল ডিভাইসের স্থানীয় উৎপাদন শুরু করা গেলে সরবরাহ ব্যবস্থা, খুচরা যন্ত্রাংশের প্রাপ্যতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
একই সঙ্গে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার ওপর জোর দেওয়া জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে রোগের পূর্বাভাস, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে রোগের চাপ অনেকাংশে কমানো সম্ভব। কারণ একটি চিরন্তন সত্য হলো—প্রতিরোধ চিকিৎসার চেয়ে উত্তম, এবং অসুস্থতা সবসময় ব্যয়বহুল।
অতএব, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হলে প্রয়োজন একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে প্রযুক্তি, দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা এবং নীতিনির্ধারণ একসঙ্গে কাজ করবে। সঠিক রোগ নির্ণয় শুধু একটি প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি একটি জাতীয় অগ্রাধিকার।
শেষ কথা,
সঠিক প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা ছাড়া উন্নত চিকিৎসা সম্ভব নয়। এখন সময় এসেছে আমরা শুধু যন্ত্র আমদানির দিকে না তাকিয়ে, একটি টেকসই, স্বনির্ভর এবং নির্ভুল রোগ নির্ণয় ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাই।
লেখক:
বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক ও গবেষক, কেটিএইচ, স্টকহোম
সাবেক পরামর্শক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্ভাবনী চিকিৎসা প্রযুক্তি গবেষক