প্রবাসী আয়ের একটি বড় অংশ সাধারণত বাড়ি তৈরি, জমি কেনা অথবা শহরে বিনিয়োগে খরচ হয়। কিন্তু সুইডেনপ্রবাসী এক বাংলাদেশি বেছে নিয়েছেন ভিন্ন পথ। দেশের প্রত্যন্ত গ্রামের মাটি, পানি ও মানুষকে টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করতে নিজের উপার্জিত অর্থের বড় অংশ ব্যয় করছেন তিনি গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা করতে। সুইডেনের স্টকহোমে বসবাসরত মৃধা সাইফুর রহমান তার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে মাগুরা জেলার নহাটা ইউনিয়নের সালদাহ গ্রামে গড়ে তুলেছেন ‘সাসটেইনেবল রিসার্চ সেন্টার’ (এসআরসি)।
শুধু গবেষণাকেন্দ্র নয়, এটি এখন একটি ক্ষুদে শিল্প ও কৃষি উদ্যোগের মিলনস্থল। সুইডেনে কর দেওয়ার পর যে অর্থ হাতে থাকে, তার সিংহভাগ তিনি বিনিয়োগ করেন এই কেন্দ্রের কার্যক্রমে। লক্ষ্য একটাই, গ্রামীণ জনপদে তৈরি করা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক মডেল, যা একইসঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
এসআরসিতে এখন নিয়মিত চলছে:
· বহুমুখী কৃষি চাষ: বিভিন্ন মৌসুমি শাকসবজি, ফলমূল ও ধানের আবাদ।
· মৎস্য ও হাঁস-মুরগি পালন: প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ, দেশি ও ব্রয়লার মুরগি এবং হাঁস পালন।
· খাদ্য নিরাপত্তায় জোর: কোনো কৃত্রিম বা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার না করে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিতকরণ।
· সৌরশক্তির ব্যবহার: সেচ কাজে ও মাছ ধরার নৌকায় ব্যবহার করা হচ্ছে সোলার প্যানেল, যা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনছে ও পরিবেশকে করছে সবুজ।
শুধু উৎপাদন নয়, এখানে স্থানীয় বেকার নারী-পুরুষদের কাজের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করা হচ্ছে, যাতে তারা নিজেরাই ভবিষ্যতে আত্মনির্ভর হতে পারেন। একজন শ্রমিক থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, সবার অংশগ্রহণে এখানে গড়ে উঠেছে এক সহযোগিতামূলক অর্থনীতি। ফলে নহাটা ইউনিয়ন ও আশপাশের এলাকায় যেমন কর্মসংস্থান বেড়েছে, তেমনি স্থানীয় বাজারেও বাড়ছে মানসম্মত ও নিরাপদ খাদ্যের যোগান।
সাইফুর রহমান নিজে সরাসরি এই কার্যক্রম তদারকি করেন। সুইডেন থেকে প্রায়ই ছুটে আসেন সালদাহ গ্রামে; স্থানীয় কৃষক, জেলে ও গৃহিণীদের সঙ্গে সমস্যা ও প্রয়োজন নিয়ে আলোচনা করেন, কীভাবে আরও উন্নত করা যায় তা নিয়ে কথা বলেন। তার ধারণা, রাজনৈতিক সমালোচনা ও বিচার আন্দোলনের পাশাপাশি প্রান্তিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক শক্তিশালীকরণই পারে দেশকে স্বৈরাচার ও দারিদ্র্যের জাতাকল থেকে মুক্ত করতে।
স্থানীয়রা জানান, এই উদ্যোগ তাদের জন্য আশার আলো হয়ে এসেছে। স্থানীয় এক যুবক বলেন, ‘আগে কাজ পেতাম না, এখন এসআরসিতে কাজ করি, আয় হয়, পাশাপাশি চাষাবাদও শিখছি। নিজের জমিতেও এখন ভালো ফলন হয়।’
গ্রামের নারীরাও এখন এসআরসি-র পোল্ট্রি ও সবজি প্রকল্পে যুক্ত হয়ে আর্থিকভাবে সচেতন হয়ে উঠছেন।
এসআরসি শুধু একটি গবেষণা বা উৎপাদন কেন্দ্র নয়, এটি এখন সুশাসন, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও মানবিক মূল্যবোধের এক জীবন্ত স্কুল। মৃধা সাইফুর রহমান মনে করেন, ‘দেশকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে ঢাকা বা রাজনীতির চৌহদ্দির বাইরে গ্রামীণ জনপদে অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটাতে হবে। একার পক্ষে সম্ভব নয় পুরো দেশ বদলে দেওয়া, কিন্তু একটি গ্রাম যদি মডেল হয়ে ওঠে, তাহলে তা হাজারো গ্রামের পথ দেখাবে।’
ভবিষ্যতে এই মডেলকে আরও সম্প্রসারিত করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সৌরশক্তিচালিত সেচব্যবস্থা, মাছ ও মুরগি পালনের আধুনিকায়ন ও নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ চেইন গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তার। তিনি জানান, শুধু নিজের উপার্জন নয়, বরং উদ্বুদ্ধ এনআরবি ও সুশীল সমাজের সহায়তায় একটি ‘গ্রিন ভিলেজ’ নেটওয়ার্ক গড়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি, যেখানে টেকসই উন্নয়নই হবে মূলমন্ত্র।
সুইডেনের আয়ের টাকা দেশের মাটিতে ফিরিয়ে দিয়ে যে পরিবর্তন আনা যায়, মাগুরার নহাটা ইউনিয়নের সালদাহ গ্রামের এসআরসি তার এক উজ্জ্বল প্রমাণ। এটি শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগ নয়, বরং প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য হয়ে উঠতে পারে একটি অনুপ্রেরণা, যেখানে কলমের পাশাপাশি কল্যাণকর বিনিয়োগও পারে দেশের ভাগ্য বদলে দিতে।
লেখক
মৃধা সাইফুর রহমান
সুইডেনের স্টকহোমে বসবাসরত এনআরবি গবেষক ও উন্নয়নকর্মী