এবার সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে মুখ খুলেছেন নব্বই দশকের জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা শাবনূর।
প্রায় ৩০ বছর পেরিয়ে গেলেও জট খুলছে না বাংলা সিনেমার ‘স্বপ্নের নায়ক’ খ্যাত অভিনেতা সালমান শাহর মৃত্যু রহস্য। আদালতে যখন নায়কের মৃত্যু হত্যা নাকি আত্মহত্যা প্রমাণ সাপেক্ষে চলছে চুল ছেড়া বিশ্লেষণ ঠিক তখনই মুখ খুললেন শাবনূর।
শনিবার (৮ আগস্ট) বিকেলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে সালমান শাহর মৃত্যু প্রসঙ্গে দীর্ঘ এক স্ট্যাটাস দেন নব্বই দশকের জনপ্রিয় এই চিত্রনায়িকা। সেখানে তিনি সালমান শাহ মৃত্যুর একাধিক আলোচিত বিষয় তুলে ধরেন। পাশাপাশি নায়কের হত্যা মামলার রাজসাক্ষী রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের একাধিক পরস্পরবিরোধী বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
শাবনূর তার স্ট্যাটাসে সালমান শাহ মৃত্যুর বিভিন্ন কারণ নিয়ে একাধিক বিতর্কিত ও অজানা বিষয় নিয়েও তথ্য দেন। একই সঙ্গে সালমান শাহ হত্যা মামলার আলোচিত একাধিক বিষয় নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন।
নাগরিক প্রতিদিনের পাঠকের জন্য চিত্রনায়িকা শাবনূরের ‘রিজভীর গালগল্প ও অসত্য বয়ান’ শিরোনামের স্ট্যাটাসটি তুলে ধরা হলো-
সালমান শাহর মৃত্যুকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে যে ব্যক্তি রাজসাক্ষী হয়েছিল তার নাম রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ। এই ব্যক্তি অন্য একটি মামলায় সালমান শাহর ছোট ভাই শাহরান চৌধুরী (বিল্টু)-কে অপহরণের চেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সালমান শাহ হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে রাজসাক্ষী হয়েছিল।
ওই জবানবন্দিতে সে দাবি করে যে, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে সালমান শাহকে হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে আরও কয়েকজনের সঙ্গে সে জড়িত ছিল। তখন সে প্রায় ৯ মাস কারাগারে বন্দী ছিল। তার ভাষ্যমতে, কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হওয়ার কিছুদিন পরই সে যুক্তরাজ্যে দেশান্তরিত হয়। পরবর্তীতে সেখানে অবস্থানকালে প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তায় সে আবারও সালমান শাহর হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে।
কিন্তু ২০১৯ সালে পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর সময় টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য দিয়ে দাবি করে সে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয় এবং সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিল। আশ্চর্যের বিষয়, সালমানের মৃত্যুর দীর্ঘ ২৯ বছর পর অল্প কিছুদিন আগে ‘আরজে নীরব’ ও ‘সময় টিভি’কে দেওয়া দুটি পৃথক সাক্ষাৎকারেও সে আবার একই দাবি করে যে, সালমান শাহর মৃত্যু হত্যা নয় বরং আত্মহত্যা।
শুধু তাই নয়, সে ওই আত্মহত্যার জন্য সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীকে দায়ী করে। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো আমার বিরুদ্ধেও মিথ্যা অভিযোগ তোলে এবং আমাকেও ওই ঘটনার জন্য বারবার দায়ী করে কথা বলে। প্রশ্ন হলো রিজভীর কোন বক্তব্যটি সঠিক?
একই ব্যক্তি যখন সময়ে সময়ে একই ঘটনার বিষয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেয় তখন তার সর্বশেষ দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। গত জুলাইয়ে প্রকাশিত তার দেয়া দুটি সাক্ষাৎকারে সে বিভিন্ন বিষয়ে আরও অনেক অসংগতিপূর্ণ, বিভ্রান্তিকর ও অসত্য বক্তব্য দিয়েছে। তার বক্তব্যগুলো পর্যালোচনা করলে সবার কাছেই সেগুলো সাংঘর্ষিক, বানোয়াট এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হবে।
অতি সম্প্রতি ‘আরজে নীরব’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রিজভী আহমেদ বলেছে, আমার প্রতি তার ভালোবাসার কথা সে কোনো দিন প্রকাশ করতে পারেনি। তবে মনে মনে নাকি আমাকে এতটাই ভালোবাসতো যে আমাকে বিয়ে পর্যন্ত করতে চেয়েছিলো এবং এখনও চায়! কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো প্রায় একই সময়ে ‘সময় টিভি’কে দেয়া আরেকটি সাক্ষাৎকারে সে আবার দাবি করেছে আমি নাকি তার এক্স গার্লফ্রেন্ড ছিলাম। শুধু তাই নয়, সে আরও দাবি করেছে যে ২০১৬ সালে আমার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল এবং ২০১৮ সালে আমাদের ডিভোর্স হয়েছে!
এখন প্রশ্ন হলো, সে তো ১৯৯৯ সাল থেকেই প্রায় ২৬-২৭ বছর ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছে এবং তার নিজের দাবি অনুযায়ী, ওই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশেই আসেনি। অন্যদিকে আমি ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে কখনোই যুক্তরাজ্যে যাইনি। তাহলে আমার সঙ্গে তার বিয়েটা কোথায় হলো? কীভাবে হলো? এর প্রমাণই বা কী? আরও মজার বিষয় হলো সে যে সময়ের কথা বলছে তার অনেক আগ থেকেই আমি বিবাহিতা ছিলাম। তার সঙ্গে সম্পর্ক তো দূরের কথা তাকে আমি কখনো দেখেছি বলেও মনে পড়ে না, আমি তাকে চিনিই না। তার এসব কথা শুনে মনে হচ্ছে, আমার সঙ্গে তার বাস্তবে কোনো বিয়ে নয়, হয়তো শুধু “স্বপ্নের বাসর”-ই হয়েছিল!
রিজভী আহমেদ প্রবল বিদ্বেষের সঙ্গে দাবি করেছে যে, আমি নাকি সালমান শাহকে ব্ল্যাকমেইল করতাম এবং তার আত্মহত্যার জন্য আমাকে দায়ী করেছে। অথচ রিজভীর নাম আমি প্রথম শুনেছি সালমান শাহর মৃত্যুর পর, যখন সে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার ঘটনায় রাজসাক্ষী হয়েছিল। তাহলে প্রশ্ন হলো সে কীভাবে এবং কোন ভিত্তিতে দাবি করছে যে আমি সালমান শাহকে ব্ল্যাকমেইল করতাম? রিজভী দাবি করছে, আমি নাকি কূটনামী করতাম বা সালমান ও তার স্ত্রীর একের কথা অন্যের কানে লাগাতাম। এমন ভিত্তিহীন গুজব আরও কিছু অসৎ ব্যক্তি ছড়িয়েছে বলে শুনেছি। এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।
এ ধরনের আচরণ কখনোই আমার স্বভাবের মধ্যে ছিল না। আমার পরিবারও আমাকে এমন শিক্ষা দেয়নি। আর এসব করার সময়ও আমার ছিল না। চলচ্চিত্র অঙ্গনের কেউই কোনোদিন বলতে পারবেন না যে আমি কারও সঙ্গে এমন কূটনামী করেছি।
রিজভীর কথাবার্তায় সালমান শাহর পরিবারের প্রতিও প্রবল ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছে। সে দাবি করেছে, সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী তার ফুফু। কিন্তু একই সঙ্গে তার সম্পর্কে এমন সব আপত্তিকর মন্তব্য করেছে যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো সালমান শাহ হত্যা মামলার অভিযুক্ত অন্যসব ১১ জনকেই সে নির্দোষ বলে দাবি করেছে!
রিজভী আহমেদের সঙ্গে আমার কখনো কোনো যোগাযোগ ছিল না, এখনও নেই। সে আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো করেছে সেগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন এবং অত্যন্ত মানহানিকর। তাছাড়া ‘আরজে নীরব’-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সে আরও অনেক উদ্ভট ও ভারসাম্যহীন কথাবার্তা বলেছে। যেমন তার দাবি অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে সে পাসপোর্ট, ভিসা ও টিকিট ছাড়াই যুক্তরাজ্যে গেছে। এমনকি বৃটিশ এয়ারওয়েজের একটি পুরো বিমান নাকি একাই ভাড়া করে সেখানে গিয়েছিল।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সে বিমানে করে নগদ এক লাখ চল্লিশ হাজার বৃটিশ পাউন্ড সঙ্গে নিয়ে যায় আর তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। সে আরও দাবি করেছে, সে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই সেখানে একটি বাড়ি কিনে ফেলেছিল। এছাড়া বাংলাদেশে তাদের কত হাজার বিঘা জমি রয়েছে সেটি নাকি সে নিজেই জানে না। এমনকি সে দাবি করেছে, সালমান খান ও শাহরুখ খানের সঙ্গে তার কথা হয়। তারা তার ফেসবুক ফ্রেন্ডস, তাদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে গ্রুপকলে আড্ডা মারে। তার এসব গালগল্পের কোনটি কতটা বাস্তবসম্মত বা বিশ্বাসযোগ্য সেই মূল্যায়ন আমি আমার ভক্ত ও দর্শকদের বিবেচনার ওপরই ছেড়ে দিলাম।
সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী (আন্টি) তার ছেলের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড দাবি করে পুনরায় মামলা করার পর ওই মামলায় কয়েকজনের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। মামলার মোড় ঘুরে যাওয়ার কারণে অভিযুক্তদের মধ্যে কেউ কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাই আমার ধারণা, তাদের প্ররোচনায় বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এমনকি আর্থিক প্রলোভনে পড়েও রিজভী আহমেদ আমার ও নীলা আন্টির বিরুদ্ধে এসব ভিত্তিহীন বক্তব্য দিয়ে থাকতে পারে। নিজেদের রক্ষা করা এবং প্রকৃত সত্যকে আড়াল করাই হয়তো তাদের উদ্দেশ্য।
আমি বরাবরের মতোই স্পষ্ট করে বলতে চাই, সালমান শাহর মৃত্যু বা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আমার বিন্দুমাত্র কোনো সংযোগ ছিল না। তিনি কীভাবে মারা গেছেন সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। সালমান শাহ শুধু একজন জনপ্রিয় নায়কই ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমার অত্যন্ত প্রিয় সহশিল্পী এবং বড় ভাইয়ের মতো একজন মানুষ। তার অকাল মৃত্যু আজও আমাকে ব্যথিত করে। আমি আন্তরিকভাবে চাই, একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটিত হোক এবং এই ঘটনায় কেউ জড়িত থাকলে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।