দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে (ঢাবি) কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার যে পরিসংখ্যান সামনে আসছে, তা আঁতকে ওঠার মতো। এই খবর কেবল উদ্বেগজনক নয়, বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ব্যবস্থার সক্ষমতাকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে।
গত পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অন্তত ৪১৪ জন শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন, যার মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন ২০৮ জন।
এর মধ্যে বিশেষ ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে একই সময়ে ২২ জন মেধাবী প্রাণ ঝরে গেছে। দেশের প্রধান এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে তাই বর্তমানে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠছে।
রাজনৈতিক সংঘর্ষ নয়, রাজনীতি নয়; ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরব ঘাতক হিসেবে হাজির হয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। সবাই বলাবলি করেন ক্যাম্পাসের শিক্ষা, ছাত্র রাজনীতিসহ নানা বিষয় নিয়ে। কিন্তু তারুণ্যের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সেভাবে কেউ আলোচনা করছে না।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার যে পরিসংখ্যানগুলো মিলছে তা ইঙ্গিত দেয় যে, ক্যাম্পাসে প্রকাশ্য রাজনৈতিক সংঘর্ষের চেয়েও একাকিত্ব, পারিবারিক চাপ এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অভাবের মতো নীরব সংকটগুলো শিক্ষার্থীদের জীবনের জন্য আরও ভয়াবহ ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালে আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ৯ জন। এরপর ২০২২ সালে সংখ্যাটি ২-এ নামলেও ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে তা ৩ জন করে বজায় থাকে। ২০২৫ সালে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে এবং সংখ্যাটি ৫-এ গিয়ে ঠেকে। এমনকি চলতি ২০২৬ সালের শুরুতেই ইতোমধ্যে ৩ জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার তথ্য মিলেছে, যা নির্দেশ করে যে সমস্যাটি সমাধানের বদলে দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
এই ট্র্যাজেডিগুলোর প্রতিটিই ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। ইংরেজি বিভাগের প্রথম হওয়া শিক্ষার্থী অনন্য গাঙ্গুলী ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে নিজ বাসায় আত্মঘাতী হন, যার নেপথ্যে ছিল দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা থেকে সৃষ্ট মানসিক অবসাদ। আবার রসায়ন বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী সীমান্ত রাজধানীর হাজারীবাগে বিষাক্ত দ্রব্য পান করেন; জানা যায়, করোনায় মায়ের মৃত্যু এবং ক্রমবর্ধমান পারিবারিক সংকট তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। এছাড়া বাড্ডায় উদ্ধার হওয়া মুনিরা মাহজাবিন মিমোর মৃত্যুও এই দীর্ঘ মিছিলে যুক্ত হওয়া আরেকটি নাম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। গত পাঁচ বছরে আত্মহত্যাকারী ৪১৪ জন শিক্ষার্থীর অর্ধেকই অর্থাৎ ২০৮ জনই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর ক্যারিয়ারের বাড়তি চাপ, প্রথম প্রজন্মের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হিসেবে পরিবারের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা এবং মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের অর্থনৈতিক টানাপোড়েন তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পরিবার থেকে দূরে থাকা এই শিক্ষার্থীরা যখন সংকটের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা সামাজিক সহায়তা পান না, তখনই তারা চরম পথ বেছে নেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নির্দেশনা ও পরামর্শদান দপ্তরের দাবি অনুযায়ী, তাদের পক্ষ থেকে কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপির সেবা চালু রয়েছে এবং নিয়মিত সেবা গ্রহণকারীদের মধ্যে আত্মহত্যার কোনো ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে সেবার পরিধি নিয়ে। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র কয়েক জন কাউন্সেলর কতটা পর্যাপ্ত? সেবার অভাব আর দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে অনেক শিক্ষার্থী সাহায্য নিতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন।
আঁচল ফাউন্ডেশনের মতে, প্রেমঘটিত সংকট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে ‘ট্রিগার’ হিসেবে কাজ করে ঠিকই, কিন্তু এর গভীরে থাকে একাকিত্ব আর মানসিক বিচ্ছিন্নতা। তাই বিচ্ছিন্ন সচেতনতা কার্যক্রম নয়, বরং একটি সহজপ্রাপ্য, গোপনীয় এবং ২৪/৭ সক্রিয় সমন্বিত মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা না থাকলে এই নীরব সংকট আরও বিস্তৃত হবে। উচ্চশিক্ষার প্রাঙ্গণগুলো যেন লাশের মিছিল না হয়ে মেধার বিকাশের নিরাপদ ক্ষেত্র হয়, তা নিশ্চিত করা এখন কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং এক অনিবার্য দায়িত্ব।
ফাউন্ডেশনের রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস ইউনিটের টিম লিডার ফারজানা আক্তার লাবনী জানান, পরিবার থেকে দূরে থাকা শিক্ষার্থীরা হঠাৎ এক ধরনের সামাজিক ও মানসিক বিচ্ছিন্নতায় পড়েন, যেখানে সংকটের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক সহায়তার অভাব পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। একই সঙ্গে পরিবারের প্রত্যাশার চাপ, বিশেষ করে প্রথম প্রজন্মের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে, মানসিক দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত অনুভূতির নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াও অনেক সময় মানসিক অবস্থাকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নির্দেশনা ও পরামর্শদান দপ্তরের পরিচালক প্রফেসর মেহজাবিন হক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপির সেবা চালু রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে শিক্ষার্থীদের মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করা হয়। তিনি আরও দাবি করেন, এই সেবা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশই সম্পর্কজনিত সমস্যায় ভোগে এবং এখন পর্যন্ত যারা নিয়মিত কাউন্সেলিং নিয়েছে, তাদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ফ্যাকাল্টি পর্যায়ে কাউন্সেলিং সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং বিভাগীয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের উপদেষ্টাদের মাধ্যমে সহায়তাও জোরদার করা হচ্ছে।