মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) থেকে শুরু হচ্ছে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা। পরীক্ষা চলবে ২০ মে পর্যন্ত। এবার পরীক্ষায় অংশ নেবে সাড়ে ১৮ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী। সচিবালয়ে সোমবার পরীক্ষা উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এ কথা জানান। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বে রয়েছেন মাহদী আমিন। তিনি জানান, এবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় বসবে মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে ছাত্র ৯ লাখ ৩০ হাজার ৩০৫ জন ও ছাত্রী ৯ লাখ ২৭ হাজার ৩৯ জন।
৯টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী রয়েছে ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৮ জন। এর মধ্যে ছাত্র ছয় লাখ ৬৭ হাজার ৩০৫ জন ও ছাত্রী সাত লাখ ৫১ হাজার ৯৩ জন। এবার ৩০ হাজার ৬৬৬টি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা তিন হাজার ৮৮৫টি কেন্দ্রে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা দেবে।
এ ছাড়া মাদরাসা বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেবে মোট তিন লাখ চার হাজার ২৮৬ জন। এর মধ্যে ছাত্র এক লাখ ৬১ হাজার ৪৯১ জন ও ছাত্রী এক লাখ ৪২ হাজার ৭৯৫ জন। দাখিল পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে মোট ৭৪২টি পরীক্ষাকেন্দ্র।
অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে এক লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে ছাত্র এক লাখ এক হাজার ৫০৯ জন ও ছাত্রী ৩৩ হাজার ১৫১ জন। মোট ৬৫৩টি কেন্দ্রে তাদের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
রুটিন অনুযায়ী এবারের পরীক্ষা বাংলা প্রথম পত্র দিয়ে শুরু হবে। প্রতিদিন সকাল ১০টায় পরীক্ষা শুরু হবে। আর ৭ থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত ব্যবহারিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এ পরীক্ষার রুটিন প্রকাশের সময়েই পরীক্ষার্থীদের জন্য ১৪টি বিশেষ নির্দেশনার কথা জানানো হয়েছিল। আর গত ১৮ এপ্রিল যানজট ও জনদুর্ভোগ লাঘবের জন্য এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে সাড়ে ৮টার থেকে প্রবেশের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে পরীক্ষা কক্ষে প্রবেশসংক্রান্ত আগের নির্দেশনা বহাল থাকবে।
এ ছাড়া প্রতিটি পরীক্ষায় প্রথমে বহুনির্বাচনি অংশ ও পরে সৃজনশীল/রচনামূলক (তত্ত্বীয়) অংশ (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বাদে) পরীক্ষা হবে। এই দুই অংশের পরীক্ষার মধ্যে কোনো বিরতি থাকবে না। কোনো অবস্থাতেই পরীক্ষার উত্তরপত্র ভাঁজ করা যাবে না।
উপদেষ্টার পরীক্ষাসংক্রান্ত পরামর্শ
এসএসসি পরীক্ষা সম্পর্কিত কিছু বিষয় ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের জানাতে চান উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, ‘জনবান্ধব সরকার ছাত্রছাত্রীদের মন থেকে ‘পরীক্ষাভীতি’ নামক শব্দটি দূর করতে চায়। সম্মানিত অভিভাবকদেরও আশ্বস্ত করতে চাই, আপনারাও সন্তানদের নিয়ে অকারণে আতঙ্কিত হবেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরীক্ষার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে, শান্ত ও স্বাভাবিকভাবে পরীক্ষা দিতে পারে, পরীক্ষা হলে এমন পরিবেশ বজায় রাখতে আমরা সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছি। আমরা খুব ভালোভাবে অবহিত আছি, এবারের এসএসসির ব্যাচ করোনাজনিত কারণে প্রাথমিক ও জুনিয়র—উভয় বৃত্তি পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ফলে এবারের এসএসসি পরীক্ষা তাদের জীবনের প্রথম ও পূর্ণ সিলেবাসের পাবলিক পরীক্ষা। সে কারণে পরীক্ষার হল যেন পরীক্ষার্থীবান্ধব থাকে, সেটা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা এটাও জানি, বিগত জুলাই অভ্যুত্থানে এই কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা কীভাবে রাজপথে প্রতিবাদমুখর থেকেছে, দেওয়ালে গ্রাফিতি এঁকে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছে। তাদের এই সৃজনশীলতা পরীক্ষায় প্রতিফলিত হবে ইনশাআল্লাহ।’
মাহদী আমিন বলেন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানরা নিরাপদ পানি, আলো ও ফ্যান, স্বাস্থ্যকর টয়লেট এবং জরুরি বিদ্যুতের ব্যবস্থা নিশ্চিত করবেন। পরীক্ষাকেন্দ্র ও এর আশপাশ যানজটমুক্ত রাখতে হবে; ছাত্রছাত্রীদের চলাচল শতভাগ নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন রাখতে হবে।’ আইনপ্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ সহিষ্ণুতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন বলেও তিনি আশা ব্যক্ত করেন।
তিনি আরও বলেন, কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেট, পরিদর্শক, ইনভিজিলেটরদের দায়িত্ব হবে পরীক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে সহায়তা করা। অকারণে আতঙ্ক সৃষ্টি নয়, প্রশ্নপত্রের কোনো অংশে দুর্বোধ্যতা থাকলে সেটা নিরসনে সহায়তা করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, এবারের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিগত সরকারের সময়ে প্রণীত হওয়ায় এ বিষয়ে নির্দেশনা প্রদানের সুযোগ আমাদের ছিল না। সেই সঙ্গে বলেন, ‘উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অহেতুক কঠোরতা আমাদের লক্ষ্য নয়, কোনো পরীক্ষার্থী যেন তার প্রাপ্য মূল্যায়ন থেকে সামান্যতম বঞ্চিত না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা চাই পরীক্ষার্থীরা দুশ্চিন্তা ছাড়াই হাসিমুখে পরীক্ষাকেন্দ্রে আসবে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উত্তরপত্রে উত্তর লিখবে এবং হাসিমুখে কেন্দ্র ত্যাগ করবে।’
তিনি আরও বলেন, আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্মৃতি যেন একজন শিক্ষার্থীর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ স্মৃতি হয়, আর পরীক্ষাভীতি শব্দটি যেন জাদুঘরে স্থান পায়—এমন শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হবে আমাদের লক্ষ্য।’
পরীক্ষকের সংখ্যা বৃদ্ধি
অন্যদিকে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং শিক্ষকদের ওপর বাড়তি চাপ কমাতে পরীক্ষকের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের গুণগত মান বজায় রাখা হবে। পরীক্ষকরা যেন পর্যাপ্ত সময় নিয়ে খাতা দেখতে পারেন, সেজন্য মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
মন্ত্রী জানান, অতীতে শিক্ষকদের ওপর অনেক বেশি খাতা দেখার চাপ থাকত, কিন্তু সময় দেওয়া হতো খুবই কম। তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষকের পক্ষে কতটি খাতা দেখা সম্ভব, তার একটি আনুপাতিক হার আমরা নির্ধারণ করেছি। শিক্ষকদের এখন আর তাড়াহুড়ো করে খাতা দেখতে হবে না। তাদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হচ্ছে, যাতে প্রতিটি শিক্ষার্থীর মেধার সঠিক মূল্যায়ন হয়।’
শিক্ষামন্ত্রী জানান, পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে কোনো ধরনের ত্রুটি বা বৈষম্য হচ্ছে কিনা তা যাচাই করতে এবার ‘রেন্ডম স্যাম্পলিং’ পদ্ধতি চালু করা হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিটি বোর্ডের কিছু খাতা দৈবচয়ন বা রেন্ডম স্যাম্পলিংয়ের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ দ্বারা পুনরায় যাচাই করা হবে। কোনো পরীক্ষক অতি কঠোরতা দেখাচ্ছেন কিনা বা অবহেলা করছেন কিনা, তা এই প্রক্রিয়ায় ধরা পড়বে। উত্তরপত্রে সঠিক তথ্য থাকলে কোনো পরীক্ষার্থী যেন প্রাপ্য নম্বর থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটিই আমাদের মূল লক্ষ্য।’
এবার খাতা দেখার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে উল্লেখ করে ড. মিলন জানান, পরীক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘খাতা দেখার পদ্ধতি আগে কখনো এভাবে খতিয়ে দেখা হয়নি। এবার আমরা এক্সামিনারদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি খাতা দেখার মান যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।’
পরীক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এমন কোনো নির্দেশনা দেইনি যে ঢালাওভাবে নম্বর বাড়িয়ে দিতে হবে। তবে খাতা দেখার সময় লিবারেল বা সহনশীল হতে হবে। একটি উত্তরের ১০টি লাইনের মধ্যে ৯টি সঠিক থাকলে তাকে যথাযথ নম্বর দিতে হবে। অহেতুক কঠোরতা করে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করা যাবে না।’
সংবাদ সম্মেলনে পরীক্ষাসংক্রান্ত আইন ও আধুনিক তদারকি ব্যবস্থা প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী ড. মিলন জানান, প্রশ্নফাঁস ও জালিয়াতি রোধে ‘পাবলিক পরীক্ষা অ্যাক্ট ১৯৮০’ সংশোধন করা হচ্ছে। নতুন আইনে ডিজিটাল ক্রাইম ও কেন্দ্র সচিবদের অবহেলার বিষয়টি শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে।