ভেজাল খাদ্য নিয়ে জনসচেতনতামূলক আলোচনা প্রচারের জেরে গত ১৫ ও ১৬ জুন প্রাকৃতিক হাট ও প্রতিষ্ঠানটির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হোসেন সোহেলের বিরুদ্ধে পরপর দুটি মামলা করেছে আকিজ ডেইরি। প্রাকৃতিক হাটের দাবি, জনস্বার্থে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে ভেজাল দুধ নিয়ে আলোচনা করায় তাদের আইনি হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি আকিজ ডেইরি।
জানা যায়, প্রাকৃতিক হাট ‘নির্ভেজাল কথা বলে’ নামে স্যোশাল মিডিয়ায় একটি সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করছে। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে ভেজাল, জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে তথ্যভিত্তিক আলোচনা করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, প্রায় দেড় মাস আগে প্রচারিত একটি পর্বে গাই গরু ছাড়া ভেজাল দুধ তৈরির বিষয়টি তুলে ধরা হয়। সেখানে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে আলোচনা করা হয়। সংশ্লিষ্ট অভিযানে ধৃত কয়েকজনের বক্তব্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছিল, যা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়।
প্রাকৃতিক হাটের দাবি, অনুষ্ঠানটি প্রচারের পর ব্যাপক সাড়া পাওয়া যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ২ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায় এবং ভেজাল খাদ্য নিয়ে নতুন করে জনমত সৃষ্টি হয়।
এরপরই আকিজ ডেইরি প্রাকৃতিক হাট ও এর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হোসেন সোহেলের বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের করে বলে অভিযোগ করেন হোসেন সোহেল।
হোসেন সোহেলের ভাষ্য, ‘জনস্বার্থে, মানুষের নিরাপদ খাদ্যের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এবং প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে ভেজাল দুধ নিয়ে আলোচনা করেছি। অথচ ভেজালের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে আজ মামলা মোকাবিলা করতে হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি শুধু আমার বা প্রাকৃতিক হাটের বিষয় নয়। এটি দেশের কোটি মানুষের নিরাপদ খাদ্যের অধিকারের প্রশ্ন। ভেজালের বিরুদ্ধে কথা বললেই যদি মামলা, হয়রানি ও চাপের মুখে পড়তে হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কেউই জনস্বার্থে কথা বলতে সাহস পাবে না।’
প্রাকৃতিক হাটের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাদের কাছে আলোচিত বিষয়গুলোর পক্ষে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত রয়েছে এবং তারা আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।
প্রাকৃতিক হাট ও হোসেন সোহেলের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘জনস্বার্থে পরিচালিত একটি সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান এবং প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে আলোচনা করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হেয় করার বিষয় ছিল না। নিরাপদ খাদ্য ও জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলা সংবিধানসম্মত অধিকার এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মামলাগুলোর আইনি দিক পর্যালোচনা করছি। আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও প্রাসঙ্গিক নথি রয়েছে। আদালতে যথাযথভাবে সবকিছু উপস্থাপন করা হবে। আমরা বিশ্বাস করি, সত্য ও আইনের ভিত্তিতেই বিষয়টির ন্যায়সঙ্গত নিষ্পত্তি হবে।’
এছাড়া তিনি মন্তব্য করেন, ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি কোনো অপরাধ হতে পারে না। যদি জনস্বার্থে তথ্যভিত্তিক আলোচনা ও সমালোচনাকে মামলা দিয়ে নিরুৎসাহিত করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তা অধিকার নিয়ে কথা বলা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
এসব বিষয়ে জানতে আকিজ ডেইরির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে নাগরিক প্রতিদিন। তবে আকিজ ডেইরির আইন কর্মকর্তা এস এম যুবায়ের চলামান মামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে নিরাপদ খাদ্য ও ভেজালবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, ভেজাল খাদ্য নিয়ে জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ কি মামলা দিয়ে থামিয়ে দেওয়া উচিত, নাকি অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্য উদঘাটনই হওয়া উচিত?
প্রাকৃতিক হাটের দাবি, এ লড়াই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি দেশের মানুষের নিরাপদ খাদ্যের অধিকার রক্ষার লড়াই। যদি ভেজালের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠগুলোকে দমন করা হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত লাভবান হবে ভেজালকারীরাই।