ভালুকায় আধিপত্যের লড়াই!
ময়মনসিংহের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক অঞ্চল ভালুকা শিল্পাঞ্চল। যেখানে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা কারখানার চাকা ঘোরার শব্দে মুখরিত থাকার কথা, সেখানে এখন বিরাজ করছে এক থমথমে নীরবতা আর চাপা আতঙ্ক।
ভোর হতেই কারখানার ফটকে শ্রমিকদের ব্যস্ততার বদলে চোখে পড়ে একদল যুবকের মহড়া। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী ক্ষমতার পালাবদলে এই শিল্পাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ এখন চলে গেছে এক প্রভাবশালী চক্রের হাতে।
ঝুট ব্যবসা, পণ্যবাহী ট্রাকের পরিবহন চাঁদাবাজি, হাট-বাজার দখল থেকে শুরু করে সরকারি বনভূমি গ্রাস—সবখানেই চলছে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার। আর এই পুরো সাম্রাজ্য চলছে স্থানীয় সংসদ সদস্যের নাম ভাঙিয়ে।
ভালুকার রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেছে গত নির্বাচনের পর থেকেই। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনে বিএনপির দলীয় প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু। অন্যদিকে, দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মুহাম্মদ মোর্শেদ আলম।
নির্বাচনের ফলাফলের পর ভোটযুদ্ধের সেই উত্তাপ রূপ নিয়েছে প্রকাশ্য ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক সংঘাতে। বিশেষ করে হবিরবাড়ি এলাকায়, যেখানে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে ঝুট ব্যবসাসহ বিভিন্ন শিল্পসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে মোর্শেদ আলমের একক প্রভাব ছিল, তা এখন হাতছাড়া হওয়ার পথে।
ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে মুহাম্মদ মোর্শেদ আলম দাবি করে বলেন, ‘দীর্ঘ আড়াই দশক ধরে সততার সাথে ব্যবসা করে আসছি। কিন্তু নির্বাচনের পর থেকে একে একে আমার সব ব্যবসা জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারখানা থেকে মালামাল বের হতে দেওয়া হচ্ছে না, ব্যবসা দখলের মরিয়া চেষ্টা চলছে। এমনকি মতবিরোধ থাকায় আমাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে এলাকা ছাড়া করা হচ্ছে।’
ব্যবসায়ীরা জানান, ভালুকায় এখন কারখানা চালানো এক দুঃসহনীয় ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন পণ্যবাহী ট্রাক আটকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কারখানার মূল ফটকে গিয়ে সৃষ্টি করা হচ্ছে কৃত্রিম উত্তেজনা, মারধর করা হচ্ছে স্টাফদের। কারখানার গেটে এসে হুমকি দেওয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা। বাধ্য হয়ে, কারখানা চালু রাখার স্বার্থে অনেকেই মুখ বুজে চাঁদা দিয়ে যাচ্ছেন। এভাবে চললে শিল্পাঞ্চল অচল হয়ে পড়বে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ঝুট সংগ্রহ থেকে শুরু করে কারখানার ভেতরের ছোটখাটো ঠিকাদারি কাজ—সবকিছুই এখন একটি নির্দিষ্ট পক্ষের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। শুধু তা-ই নয়, এই সুযোগে স্থানীয় বন বিভাগের বিপুল পরিমাণ সরকারি জমি দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের মহোৎসব শুরু হয়েছে। একই সাথে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বাড়িঘর ও কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর এবং লুটপাটের ঘটনাও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।
এ বিষয়ে নাগরিক প্রতিদিনের সঙ্গে কথা বলেন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি জানান, চাঁদাবাজির অভিযোগ সরাসরি তাদের সামনে খুব বেশি না এলেও পোশাক কারখানার উৎপাদনজনিত ওয়েস্টেজ (বর্জ্য) হাতিয়ে নিতে বিভিন্ন মহল থেকে কারখানাগুলোর ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়। যেহেতু এসব ওয়েস্টেজ পুনর্ব্যবহার (রিসাইকেল) করা হয় এবং এর আর্থিক মূল্য রয়েছে, তাই নির্দিষ্ট পক্ষকে তা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই শুরু হয় হুমকি-ধমকি।
অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহল এ ধরনের চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি জমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়েও কারখানা মালিকদের ওপর প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এমন পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাওয়া হলে ভালুকা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম একাধিক গণমাধ্যমে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে তীব্র বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। এসব সহিংস ঘটনায় থানায় নিয়মিত মামলা রুজু হয়েছে এবং পুলিশ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
তবে মামলার পরও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের।
নিজের অনুসারী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে ওঠা এই গুরুতর অভিযোগ প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কেউ যদি আমার নাম ভাঙিয়ে কোনো ধরনের অপকর্ম বা চাঁদাবাজি করার চেষ্টা করে, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে কোনো প্রকার প্রভাব খাটানোর অনুমতি আমি দিইনি।’ এছাড়াও অস্থিরতা সৃষ্টিকারীদের নিয়ন্ত্রণে তিনি নিজেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
তবে সংসদ সদস্যের এমন কঠোর হুঁশিয়ারির পরও মাঠপর্যায়ে তার অনুসারীদের তাণ্ডব থামছে না।
ইতোপূর্বে ময়মনসিংহের ভালুকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগে বিএনপি নেতা ফখরুদ্দিন আহমেদ বাচ্চুকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। বিগত ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির পক্ষ থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছিল।
বহিষ্কারের পর তার বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করেছিল বিএনপি। ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর থেকে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে বিভিন্ন মিল ফ্যাক্টরি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হুমকি দেওয়া এবং লোকজন পাঠিয়ে পেশিশক্তির মহড়া দেখিয়ে স্বার্থ হাসিলের অভিযোগে তাকে সেসময়ে বহিস্কার করা হয় বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তীতে অবশ্য তার বহিস্কারাদেশ উঠিয়ে দল থেকে তাকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়।
স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ভাওয়াল কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী ফখরুদ্দিন আহামেদ বাচ্চু আওয়ামী লীগ এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে আঁতাত করে আনুমানিক পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কার্যাদেশ পেয়ে বহাল তরিয়াতে কাজ করে যান।
স্থানীয়রা বলছেন, দেশের অন্যতম বৃহৎ এই শিল্পাঞ্চলে চলমান এই সংঘাত কেবল স্থানীয় আইনশৃঙ্খলারই অবনতি ঘটাচ্ছে না, বরং সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। সচেতন মহল ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের এখন একটাই দাবি অবিলম্বে প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক, ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক এবং কোনো দলের তকমা না দেখে প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তির আওতায় এনে ভালুকায় আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হোক। তা না হলে, এই শান্ত শিল্পাঞ্চল অচিরেই পরিণত হবে এক অন্ধকার অপরাধের অভয়ারণ্যে।