রাজধানীর মিরপুরে বিগত আওয়ামী সরকারের সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত গফুর মোল্লা ও রহমান মোল্লা নামে সহোদর দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভোল পাল্টিয়ে ভূমি দখল, অর্থ আদায়, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। বিগত সরকারের আমলে স্থানীয় সংসদ সদস্য মাঈনুল হোসেন খান নিখিলের ছত্রছায়ায় এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে এই দুই সহোদর। তবে ৫ই আগস্টের পর খানিক সময়ের জন্য তারা গা-ঢাকা দিলেও সম্প্রতি ক্ষমতাসীন স্থানীয় প্রভাবশালী নেতার নাম ভাঙিয়ে ফের এসব কর্মকাণ্ড করেছেন।
সম্প্রতি রাজধানীর অদূরে সাভারের বিরুলিয়ার ছোট ওয়ালিয়া মৌজার সাড়ে ১১ শতক জমি বিক্রি করতে গিয়ে এই দুই সহোদরের বাধার মুখে পড়েন ভুক্তভোগী তাহমিনা আক্তার। ভুক্তভোগী তাহমিনা ও তার জার্মান প্রবাসী বড় ভাই সাইদুল ইসলাম এসব অভিযোগ করেন।
সাইদুল ইসলাম জানান, ২০১৫ সালে ১২ লাখ টাকায় আকতার হোসেন মোল্লার কাছ থেকে সাফ কাবলা দলিল মূলে সাড়ে ১১ শতক জমি কেনেন তার বোন তাহমিনা আক্তার ও ভগ্নিপতি মো. দুলাল। সম্প্রতি তার ভগ্নিপতি দুলাল মারা যান। ফলে টাকার প্রয়োজনে জমিটি বিক্রি করেন তার বোন। কিন্তু বিক্রিত জমি ক্রেতাকে বুঝিয়ে দিতে গেলে সেখানে বাধা প্রদান করেন গফুর মোল্লা এবং রহমান মোল্লা। তাদের কোনো প্রকার বৈধ দলিল বা কাগজপত্র না থাকলেও বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় এক প্রভাবশালী নেতার নাম ভাঙিয়ে জমি দখল বা সেখান থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছেন তারা। মূলত তাদের কোন পেশা নেই, এসব করাই তাদের পেশা।
সূত্রমতে, জুলাই গণহত্যা মামলার আসামীর তালিকায় ছিল গফুর মোল্লার নাম। মিরপুর মডেল থানার সাবেক ওসি মোহাম্মদ গোলাম আজমের সময়ে অনেকের মতো গফুর মোল্লাও নাম কাটিয়ে নেন। গত ৩ মে ওসি মোহাম্মদ গোলাম আজমকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠায় মিরপুর মডেল থানা থেকে প্রত্যাহার করে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। ফলে বিগত সরকারের আমলের দোসর হওয়া সত্ত্বেও বীরদর্পে আগের মতোই এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড শুরু করেছেন তারা।
ওই সাড়ে ১১ শতক জমির দলিল ও অন্যান্য কাগজপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই জমিটির মূল মালিক ছিলেন পাগল চাঁন মন্ডল, গোপিন চাঁন মন্ডল ও সাগর চাঁন মন্ডল। তাদের কাছ থেকে জমিটি কিনেছিলেন আকতার হোসেন মোল্লা, সিদ্দিক মোল্লা ও মোক্তার মোল্লা। ফলে ক্রয়সূত্রে এই জমির একটি অংশ অর্থাৎ সাড়ে ১১ শতক জমির মালিক হলেন আকতার হোসেন মোল্লা, যার চৌহদ্দিও নির্ধারণ করে দিয়েছিল সাব রেজিস্ট্রার অফিস।
এই আকতার হোসেন মোল্লার কাছ থেকেই জমি কিনেছিলেন মো. দুলাল ও তার স্ত্রী তাহমিনা আক্তার। খাজনা, খারিজ ও নাম জারিসহ সব কাগজপত্রই রয়েছে তাদের স্বামী-স্ত্রীর নামে। কিন্তু জমিটি বিক্রির পর ক্রেতাকে বুঝিয়ে দিতে গেলে সেখানে বাধা দেন ওই দুই সহোদর।
সাইদুল ইসলাম জানান, আকতার হোসেন মোল্লার বাবার নাম বারেক মোল্লা। বারেক মোল্লা সে সময়ে একাধিক বিয়ে করেছিলেন। গফুর মোল্লা ও রহমান মোল্লা আকতার হোসেন মোল্লার সৎ ভাই। যদি ওই জমিটি পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত হত, তাহলে সেখানে তাদের ওয়ারিশের বিষয়টির প্রশ্ন উঠতো। কিন্তু জমিটি আকতার হোসেন মোল্লার কেনা সম্পত্তি ছিল। ফলে সেখানে ওয়ারিশের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। মূলত সেখানে তাদের কোনো জমি নেই। তবুও তারা বাধা প্রদান করছেন।
তিনি আরও জানান, এই জমিটির কাগজপত্র মর্টগেজ দিয়ে তিনি, তার ভগ্নিপতি ও ছোট বোন স্থানীয় মিরপুর কৃষি ব্যাংক থেকে লোন নিয়েছিলেন। সেই লোনের টাকা পরিশোধও হয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যদি জমির মালিকানা, কাগজপত্র, চৌহদ্দি, খাজনা-খারিজ ঠিক না থাকে, তাহলে কোনো ব্যাংক কি কাউকে লোন দেয়।
ভুক্তভোগী তাহমিনা আক্তার নাগরিক প্রতিদিনকে জানান, তিনি ও তার স্বামীর সারা জীবনের উপার্জিত অর্থ দিয়ে জমি কিনেছেন। কিন্তু রহমান মোল্লা ও গফুর মোল্লা তাকে এই জমি ভোগদখল করতে দিচ্ছেন না। তাদের বাধার কারণে এই জমি অন্যত্র বিক্রিও করতে পারছেন না।
এদিকে সূত্র বলছে, গফুর মোল্লা বিগত সরকারের সময়ে মাদক ব্যবসা করতেন। তার বিরুদ্ধে মিরপুর মডেল থানায় মাদকের মামলাও হয়েছে। গফুর মোল্লা মূলত মাঈনুল হোসেন নিখিলের অন্যতম সহযোগী ছিলেন। তার ছত্রছায়ায় থেকেই মাদক ব্যবসা, ভূমি দখলসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কাজ করতেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর তার বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যা মামলা হওয়ায় তাকে এলাকায় খুব একটা দেখা যায়নি। কিন্তু সম্প্রতি তিনি কোনো এক প্রভাবশালী স্থানীয় বিএনপি নেতার নাম ভাঙিয়ে ফের পুরোনা মাদক ব্যবসা শুরু করেছেন।
মিরপুর মডেল থানায় খবর নিয়ে দেখা যায়, ২০১৮ সালে মাদকসহ হাতেনাতে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন গফুর মোল্লা।
এসব বিষয়ে জানতে গফুর মোল্লাকে ফোন করা হলে তিনি জমিটি তার নয় বলে স্বীকার করেন। তিনি নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘জমিটি মূলত আমার বড় ভাইয়ের। আমি চেয়েছিলাম একটা মধ্যস্থতা করতে। আমি তাদেরকে বলেছি একজন উকিল নিয়ে বসে ঠিক করতে।’
কোনো মাদকের মামলা আছে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি অনেক আগে একটি মামলা আছে বলেও স্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, বিগত সরকারের সময়ে তিনি বিএনপির রাজনীতি করার কারণে তৎকালীন ওসি সালাউদ্দিন তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে মাদকের মামলা দিয়েছেন। তার পুরো পরিবার বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত বলেও দাবি করেন তিনি। তিনি এই প্রতিবেদকের সাথে সাক্ষাৎ করে কথাও বলতে চেয়েছেন।
এসব বিষয়ে রহমান মোল্লা মোবাইলে নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘জমিটা আসলে আমার। আপনারা সামনাসামনি কাগজপত্র নিয়ে বসেন, আমার কাগজপত্র দেখেন। উনাদেরটাও দেখেন। যেখানে যে জমি পাবেন, তাদেরটা তারা নিবেন। আমার জমি দেখিয়ে যদি অন্যের কাছে বিক্রি করেন, সেটাতো হয় না।’
এ বিষয়ে মিরপুর মডেল থানার ওসি হাফিজুর রহমান নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’