জোয়ার এলেই হাঁটুপানিতে ডুবে যায় ঘরবাড়ি, রান্নাঘর, মসজিদ ও চলাচলের রাস্তা। ঘর থেকে বের হওয়ার উপায় থাকে না, রান্না বন্ধ হয়ে যায়। শিশুদের নিয়ে পানির মধ্যে দিন কাটাতে হয় বাসিন্দাদের। পানি নেমে গেলেও ঘরের ভেতর জমে থাকা কাদা পরিষ্কার করে আবার বসবাস শুরু করতে হয়।
বছরের পর বছর জোয়ারের পানির সঙ্গে এমন যুদ্ধ করেই জীবন কাটছে বাগেরহাট সদর উপজেলার কাড়াপাড়া ইউনিয়নের মাজিডাঙ্গা আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৪০ পরিবারের।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, আশ্রয়ণ প্রকল্পটি নির্মাণের সময় পর্যাপ্ত মাটি দিয়ে জায়গাটি উঁচু করা হয়নি। যার কারণে বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের পানি ঠেকানোর কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য জোয়ারেই পুরো প্রকল্প পানিতে তলিয়ে যায়। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয় শিশু, নারী ও বয়স্কদের।
শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে সরেজমিনে মাজিডাঙ্গা আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, জোয়ারের পানিতে প্রকল্পের রাস্তা ও বসতঘরগুলো প্লাবিত। অনেক ঘরের মেঝেতে হাঁটুপানি। রান্নাঘর ডুবে থাকায় স্বাভাবিকভাবে রান্নাবান্না করতে পারছেন না বাসিন্দারা। পানিতে তলিয়ে গেছে স্থানীয় মসজিদও। ফলে নামাজ আদায়েও বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে তাদের।
১৯৯৮ সালে মাজিডাঙ্গা গ্রামে ৬০টি ভূমিহীন পরিবারকে ঘর ও জমি বরাদ্দ দেওয়ার মাধ্যমে আশ্রয়ণ প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়। পরে প্রকল্পের সামনের চরভরাটি জমিতে আরও ৮০টি ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। বর্তমানে প্রায় ১৪০ পরিবারের সাড়ে চার শতাধিক মানুষ এখানে বসবাস করছেন।
বাসিন্দা রাসেল বলেন, ‘জোয়ার এলে ঘরের ভেতর পানি ঢুকে যায়। রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কোথাও যাওয়া যায় না। মনে হয় আমরা দ্বীপের মানুষের মতো হয়ে যাই। পানি নেমে যাওয়ার পরও কাদা পরিষ্কার করতে অনেক সময় লাগে।’
মরিয়ম বেগম বলেন, ‘বাচ্চাদের নিয়ে পানির মধ্যে থাকতে খুব ভয় লাগে। রান্নাঘর ডুবে গেলে রান্না করা যায় না। অনেক সময় শুকনা খাবার খেয়ে থাকতে হয়। ঘরের ভেতরের পানি নেমে গেলেও কাদা পরিষ্কার করতে হয়।’
মসজিদের সহ-সভাপতি আকরাম বলেন, ‘জোহরের নামাজের জন্য আজান দেওয়ার কিছুক্ষণ পরই জোয়ারের পানি এসে মসজিদসহ পুরো এলাকা প্লাবিত করে। পানির কারণে নামাজ আদায় করাও সম্ভব হয়নি।’
এলাকাবাসী মো. জাকির বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই মানুষগুলো পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে বসবাস করছেন। বর্ষা ও জোয়ারের সময় তাদের দুর্ভোগ চরমে ওঠে। শুধু একটি স্থায়ী বাঁধ ও ভালো সড়ক নির্মাণ করা হলে তাদের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসবে।’
কাড়াপাড়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য ও বিএনপি নেতা মো. আবু হানিফ হাওলাদার বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্প তৈরির সময় প্রয়োজনের তুলনায় কম মাটি দিয়ে জায়গা উঁচু করা হয়েছিল। এ কারণে জোয়ার এলেই পানি ঢুকে পড়ে। দ্রুত প্রকল্পের চারপাশে বেড়িবাঁধ নির্মাণ, পাকা সড়ক তৈরি এবং জরাজীর্ণ ঘর সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বাসিন্দাদের দাবি, তারা কোনো আর্থিক সহায়তা বা ত্রাণ চান না। বছরের পর বছর জোয়ারের পানিতে যে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, তা থেকে স্থায়ীভাবে মুক্তি চান তারা। এজন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পের চারপাশে স্থায়ী বেড়িবাঁধ, উঁচু ও পাকা সড়ক এবং জরাজীর্ণ ঘরগুলো সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহানাজ পারভীন বীথি বলেন, মাজিডাঙ্গা আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাড়িঘর জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যাওয়ার বিষয়টি জানতে পেরে দ্রুত সমস্যা সমাধানে প্রকল্প গ্রহণের জন্য পিআইওকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরেজমিনে পরিদর্শনের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।