চলতি মৌসুমে মানিকগঞ্জে পাটের সন্তোষজনক ফলন ও ভালো বাজারদর কৃষকদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। ফলে জেলার গ্রামাঞ্চলে পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো ও শুকানোর কাজে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও পাট কেটে পানিতে জাগ দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও জাগ দেওয়া পাট থেকে আঁশ ছাড়ানোর কাজ চলছে। কেউ কেউ আঁশ পরিষ্কার করে রোদে শুকিয়ে দ্রুত বাজারজাত করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সময়মতো পাট বিক্রি করতে পারলে ভালো দাম পাওয়া যাবে—এমন প্রত্যাশায় কৃষকদের ব্যস্ততাও বেড়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলার সাতটি উপজেলায় মোট ৪ হাজার ৫৭৬ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। এর মধ্যে তোষা পাটের আবাদ হয়েছে ৩ হাজার ৭৫৫ হেক্টর জমিতে। এছাড়া দেশি পাট ৭৯৮ হেক্টর, মেস্তা ১৮ হেক্টর এবং কেনাফ ৫ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে।
সিংগাইর উপজেলার কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, বাজারে পাটের দাম ভালো থাকায় এবার লাভের সম্ভাবনা দেখছেন তারা। পাটের পাশাপাশি পাটখড়িরও ভালো চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে প্রতি আঁটি পাটখড়ি ৪০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
ঘিওরের কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার পাট জাগ দেওয়ার জন্য পানির সংকট কম। তবে শ্রমিক সংকট বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাদাপানিতে দীর্ঘ সময় কাজ করতে অনেকে আগ্রহী না হওয়ায় শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে বেড়েছে শ্রমিকের মজুরিও।
সাটুরিয়ার কৃষক রুস্তম ব্যাপারি অভিযোগ করে বলেন, হাটে পাট বিক্রির সময় ওজন নিয়ে অনিয়ম হচ্ছে। প্রতি মণে অতিরিক্ত পাট নেওয়ার পাশাপাশি খাজনাও দিতে হয়। এতে কৃষকের প্রকৃত লাভ কমে যাচ্ছে। এসব সমস্যার সমাধান হলে কৃষকরা পাট চাষে আরও বেশি উৎসাহিত হবেন বলে মনে করেন তিনি।
আরেক কৃষক সাইদুর রহমান বলেন, দীর্ঘ সময় কাদাপানিতে কাজ করার কারণে অনেক কৃষক ও শ্রমিক চুলকানি, জ্বরসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। এসব সমস্যায় প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া যায় না। তবে এ বছর পাটের ফলন ভালো হয়েছে। বাজারদর ভালো থাকলে শেষ পর্যন্ত লাভের মুখ দেখার আশা করছেন তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাজাহান সিরাজ বলেন, অনুকূল আবহাওয়া ও ভালো বাজারদরের কারণে চলতি মৌসুমে জেলায় পাটের আবাদ বেড়েছে এবং নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। কৃষকদের বিভিন্ন সমস্যা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে পাট জাগ দেওয়ার সময় কৃষক ও শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ভালো ফলন, সন্তোষজনক দাম ও পাটখড়ির বাড়তি চাহিদায় চলতি মৌসুমে মানিকগঞ্জের কৃষকদের মধ্যে পাট চাষ ঘিরে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছে। তবে শ্রমিক সংকট, বাজারে ওজনের অনিয়ম এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির মতো সমস্যাগুলো দূর করা গেলে ‘সোনালি আঁশ’ আরও বেশি স্বস্তি এনে দেবে কৃষকের ঘরে।