পাঁচ বছরেও চালু হয়নি
দূর থেকে দেখলে মনে হবে আধুনিক একটি সরকারি হাসপাতাল। বহুতল ভবন, পরিচ্ছন্ন কক্ষ, চেয়ার-টেবিল, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি) ব্যবস্থা, এলইডি টেলিভিশনসহ প্রয়োজনীয় প্রায় সকল সরঞ্জামই রয়েছে। কিন্তু প্রধান ফটকে তালা, করিডোরজুড়ে নীরবতা আর চারপাশজুড়ে আগাছা-ঝোপঝাড়।
প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার তালিয়া গ্রামের ২০ শয্যার হাসপাতালটি নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পাঁচ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো চালু হয়নি। যার কারণে সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামোটি ব্যবহারের আগেই দিনদিন অচল হয়ে পড়ছে। চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাজারো মানুষ।
রাজধানীর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও পূর্বাচল নতুন শহরের লাগোয়া কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের তালিয়া গ্রামে প্রায় ২ দশমিক ৭৩ একর জমির ওপর হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় একটি মূল হাসপাতাল ভবনের পাশাপাশি তিনটি আবাসিক কোয়ার্টার, একটি জেনারেটর রুম, গ্যারেজ ও পাম্প হাউস নির্মাণ করা হয়েছে।
সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, ভবনের ভেতরে প্রয়োজনীয় অনেক আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি থাকলেও সেখানে নেই কোনো চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা রোগী। হাসপাতালের চারপাশ আগাছা ও ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে। পরিত্যক্ত পরিবেশে মশা-মাছি, বিভিন্ন কীটপতঙ্গ, কুকুর ও শিয়ালের বিচরণও চোখে পড়ে।
এছাড়া হাসপাতালের খোলা জায়গার একটি অংশ স্থানীয়রা কৃষিকাজে ব্যবহার করছেন। কেউ সবজি চাষ করছেন, কেউ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে জমি ব্যবহার করছেন। অথচ স্বাস্থ্যসেবার জন্য নির্মিত সরকারি সম্পদ ব্যবহারে কার্যকর কোনো নজরদারি নেই।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। প্রায় দুই বছরের নির্মাণকাজ শেষে ২০২০ সালের ২৭ ডিসেম্বর প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়। পরে ২০২১ সালের ২০ জুন হাসপাতালটি গাজীপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়।
এরপর ২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর হাসপাতাল চালুর প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়। একই বছরের ডিসেম্বরে জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথমে ২৫টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হলেও ২০২৪ সালের মার্চে অর্থ মন্ত্রণালয় ১৬টি পদ অনুমোদন দেয় এবং একই বছরের অক্টোবরে পদগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে সৃষ্টি করা হয়।
তবে বর্তমানে একজন আবাসিক মেডিকেল অফিসার, একজন ফার্মাসিস্ট ও দুইজন নার্স পদায়ন থাকলেও তারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালন করছেন। বাকি ১২টি পদ এখনো শূন্য রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালটি চালু না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ অর্থনৈতিক কোড (ইকোনমিক কোড) না থাকা। এ কোড না থাকায় হাসপাতালের নামে কোনো বাজেট বরাদ্দ হয়নি। যার কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ওষুধ ক্রয়, বিদ্যুৎ বিল, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশাসনিক ব্যয়সহ প্রয়োজনীয় কোনো খাতে অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠানো হলেও এখনো কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা হারুন-আর-রশিদ বলেন, ‘প্রতিবারই শুনি হাসপাতাল চালু হবে। কিন্তু বছর পার হয়ে যায়, কোনো পরিবর্তন দেখি না। চালু হলে আমাদের অনেক উপকার হতো।’
স্থানীয় চিকিৎসক মো. ওমর কায়ছার বলেন, ‘সরকার বিপুল অর্থ ব্যয় করে হাসপাতাল নির্মাণ করেছে। কিন্তু সেটি চালু না হওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক। দ্রুত হাসপাতালটি চালু করা প্রয়োজন।’
স্থানীয় বাসিন্দা শিউলি বেগম বলেন, ‘অসুস্থ হলে অনেক দূরে যেতে হয়। বিশেষ করে প্রসূতি রোগীদের নিয়ে ঢাকায় যেতে খুব কষ্ট হয়। হাসপাতালটি চালু হলে আমাদের দুর্ভোগ অনেক কমে যেত।’
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজওয়ানা রশীদ বলেন, ‘এখানে দুইজন চিকিৎসক পদায়ন রয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক কোড না থাকায় কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’
গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, ‘ওষুধ, জনবল ও বাজেট—সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে। তবে ধীরে ধীরে সমস্যার সমাধান হচ্ছে। আশা করছি দ্রুতই হাসপাতালটি চালু করা যাবে।’