আম্পানের ক্ষতি
আজ ভয়াল ২০ মে। প্রলয়ঙ্কারী সুপার সাইক্লোন আম্পানের আজ ছয় বছর পূর্ণ হলো। ২০২০ সালের এই দিনে সাতক্ষীরার উপকূলে আঘাত হানা এই ঝড়ের ক্ষত আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি সাতক্ষীরার প্রান্তিক জনপদ। সরকারি-বেসরকারি কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও, পুনর্বাসন প্রক্রিয়া থমকে থাকায় উপকূলের মানুষ এখনো চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। দীর্ঘ ছয় বছরেও ভাঙা বাঁধ আর নোনা জলের কান্না থামেনি উপকূলের কয়েক লাখ মানুষের।
আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, ২০২০ সালের ২০ মে সাতক্ষীরা উপকূলে ঝড়ের সর্বোচ্চ গতিবেগ একপর্যায়ে ঘণ্টায় ১৪৮ কিলোমিটারে পৌঁছায়। টানা ১৫ ঘণ্টা চলে ঝড়, সৃষ্টি হয় ১২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস। প্রাথমিক হিসাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১১০০ কোটি টাকা।
জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরায় ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে ১২ হাজার ৬৯৮টি মৎস্য ঘেরে ১৭৬ কোটি ৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। কৃষিতে ১৩৭ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার টাকার ক্ষতির মধ্যে রয়েছে ৬৫ কোটি ১৮ লাখ ৪০ হাজার টাকার আম, ৬২ কোটি ১৬ লাখ টাকার সবজি, ১০ কোটি ২২ লাখ ৪০ হাজার টাকার পান এবং ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার তিল। পশু সম্পদ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৯৫ লাখ ৪৮ হাজার ৬১৬ টাকা।
আম্পানের তাণ্ডবে জেলার মোট ৮৩ হাজার ৪১৩টি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছিল। এর মধ্যে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয় ২২ হাজার ৫১৫টি এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৬০,৯১৬টি। এছাড়া জেলার ৮১ কিলোমিটার রাস্তা এবং ৫৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আম্পানের আঘাতে সাতক্ষীরা উপকূলের শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী, গাবুরা, পদ্মপুকুর, কাশিমাড়ি এবং আশাশুনি উপজেলার শ্রীউলা ও প্রতাপনগর ইউনিয়নের অধিকাংশ বেড়িবাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হয়। মেরামত করতে না পারায় দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় ধরে এই ইউনিয়নগুলোর হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে ছিল। বহু এলাকায় প্লাবিত লোকালয়ের মধ্যেই নিয়মিত জোয়ার-ভাটা চলেছে এবং দুর্গত পরিবারগুলোকে নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়েছে।
প্রতাপনগরের বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম জানান, ‘‘ঘূর্ণিঝড় আইলার চেয়েও ‘আম্পান’ আমাদের প্রতাপনগরে বেশি ক্ষতি করেছে। বাঁধ ভেঙে দুই বছরেরও বেশি সময় লোকালয়ে জোয়ার-ভাটা চলেছে। ফলে, আমাদের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও মৎস্যঘের সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। আজ এত বছর পরও মানুষ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি।কাজকর্মের তীব্র অভাব, যোগাযোগব্যবস্থাও বিপর্যস্ত। জোয়ার এলেই এখনো সবাই আতঙ্কে থাকে। আমাদের একমাত্র দাবি—জোড়াতালির রিং বাঁধ নয়, দ্রুত ধসে যাওয়া বাঁধগুলো মেরামত করে টেকসই ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হোক।’’
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড-এর তথ্য অনুযায়ী, শ্যামনগর, আশাশুনি ও সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের বেশ কিছু বেড়িবাঁধ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এদিকে, মেগা প্রকল্পের আওতায় শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে বেড়িবাঁধ উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে।
গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, ‘আম্পানের ভয়াবহ ক্ষত ও দীর্ঘদিনের অবর্ণনীয় কষ্ট কাটিয়ে গাবুরার মানুষ এখন আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। সরকারের বিশেষ নজরদারি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বিত প্রচেষ্টায় ভাঙনকবলিত প্রধান পয়েন্টগুলোতে টেকসই ও আধুনিক বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। বর্তমানে এখানে বড় আকারের মেগা প্রকল্প চলমান রয়েছে, যার কাজ শেষ হলে এই এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট অনেক কমে যাবে।
আমরা আশাবাদী, এই প্রকল্পগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে গাবুরা তথা পুরো উপকূলীয় অঞ্চল সম্পূর্ণ নিরাপদ হবে এবং এই জনপদের মানুষ টেকসই সুরক্ষাসহ নতুন করে তাদের কর্মসংস্থান ও মাথা গোঁজার ঠাঁই ফিরে পাবে।’
প্রতাপনগর ইউপি চেয়ারম্যান আবু দাউদ ঢালী জানান, ‘ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে সাতক্ষীরার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল আমার প্রতাপনগর ইউনিয়ন। তবে সেই ভয়াবহ ক্ষত ও দীর্ঘদিনের অবর্ণনীয় কষ্ট কাটিয়ে প্রতাপনগর এখন আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে এই ইউনিয়নকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আমরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছি। টেকসই বাঁধের কাজ সম্পন্ন হলে এবং এই চলমান পুনর্বাসন প্রক্রিয়া সফল হলে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ দূর হবে।’
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, উপকূলীয় এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধসমূহ পর্যায়ক্রমে সংস্কার ও শক্তিশালীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলমান প্রকল্পসমূহ নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।