সাতক্ষীরা জেলাজুড়ে গত কয়েকদিন ধরে ডিজেল ও পেট্রোলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, যার ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন লোকাল বাস চালক এবং সাধারণ পরিবহন শ্রমিকরা। জ্বালানি তেলের অনিয়মিত সরবরাহ এবং দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে জেলার অভ্যন্তরীণ রুটে যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়েছে।
উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা থেকে প্রতিদিন তিন শতাধিক বাস দেশের বিভিন্ন প্রান্তে— ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দূরপাল্লার রুটে চলাচল করে। পাশাপাশি সাতক্ষীরা-খুলনা, সাতক্ষীরা-যশোর,সাতক্ষীরা-মুন্সিগঞ্জসহ জেলার বিভিন্ন লোকাল রুটে আরও তিন শতাধিক বাস নিয়মিত চলাচল করছে। যাত্রীসেবার এই বিশাল নেটওয়ার্ক সচল রাখতে প্রতিদিনই প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ ডিজেল।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) জেলার বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে, স্থানীয় ফুয়েল স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত ডিজেল সরবরাহ না থাকায় নির্ধারিত একটি স্টেশন থেকে জ্বালানি সংগ্রহ সম্ভব হচ্ছে না। ফলে লোকাল রুটের বাসগুলোকে একাধিক ফিলিং স্টেশন ঘুরে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, তেমনি নির্ধারিত সময়সূচিও ব্যাহত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জেলার বড় ও প্রতিষ্ঠিত বাস সার্ভিসগুলোর নিজস্ব ফুয়েল স্টেশন থাকায় তাদের জ্বালানি সংগ্রহে তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছে না। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ থাকায় তারা নির্ধারিত সময়সূচি মেনে নির্বিঘ্নে বাস চলাচল চালিয়ে যেতে পারছেন। তবে লোকাল রুটে চলাচলকারী বাস ও ছোট পরিবহন কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। এসব পরিবহনকে জ্বালানি সংগ্রহে চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।
সাতক্ষীরার লোকাল রুটে চলাচলকারী বাসচালক সিরাজুল ইসলাম জানান, সাধারণভাবে একটি বাস প্রতি লিটার ডিজেলে গড়ে ৩ থেকে ৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে পারে। বাসের ইঞ্জিন, লোড, রাস্তার অবস্থা ও ট্রাফিকের ওপর ভিত্তি করে মাইলেজ পরিবর্তিত হয়। সে হিসেবে সাতক্ষীরা থেকে কালিগঞ্জ রুটে প্রায় ১০০ কিলোমিটার যাওয়া-আসায় একটি বাসের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। তবে বর্তমানে লোকাল রুটের বাসগুলো সর্বোচ্চ ৩০ লিটার পর্যন্ত তেল পাচ্ছে, যা একাধিক ট্রিপ পরিচালনায় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
তিনি আরও জানান, যেসব বাস মালিকের নিজস্ব ফুয়েল স্টেশন রয়েছে বা পাম্প মালিকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক আছে, তারা তুলনামূলকভাবে সহজেই পর্যাপ্ত তেল সংগ্রহ করতে পারছেন।
দূরপাল্লার একটি পরিবহন কোম্পানির কাউন্টার ম্যানেজার সোহেল হোসেন জানান, যাত্রীদের সময়মতো সেবা দিতে গিয়ে তারা চাপে রয়েছেন। তেলের অভাবে নির্ধারিত সময়ে গাড়ি ছাড়তে না পারায় যাত্রী অসন্তোষ বাড়ছে, অনেক ক্ষেত্রে টিকিট বাতিলও করতে হচ্ছে। এ কারণে ট্রিপের সংখ্যা কমাতে হয়েছে।
সাতক্ষীরা-খুলনা রুটে চলাচলকারী বাসচালক রুবেল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বড় কোম্পানির গাড়িগুলো সহজেই তেল পাচ্ছে। কিন্তু, ছোট পরিবহনগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও পর্যাপ্ত ডিজেল পাচ্ছে না। এতে ট্রিপ কমে যাওয়ায় আয়ও কমে গেছে।
সাতক্ষীরা দূরপাল্লার বাস মালিক সমিতির সভাপতি তাহমিদ চয়ন বলেন, জেলার পরিবহন ব্যবস্থা সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে ছোট ও মাঝারি পরিবহন কোম্পানিগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি বাসকে গন্তব্যে পৌঁছাতে পথে একাধিক পাম্প থেকে তেল নিতে হচ্ছে, এতে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ছে এবং যাত্রীসেবায় বিঘ্ন ঘটছে। তিনি পরিবহন খাতের জন্য আলাদা করে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
অন্যদিকে সাতক্ষীরা জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুস সোবহান খোকন বলেন, লোকাল রুটের বাসগুলো সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে। প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল এসব বাস তেল না পাওয়ায় নির্ধারিত ট্রিপ দিতে পারছে না। এতে চালক-হেলপার থেকে শুরু করে মালিক, সবাই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। কিছু স্টেশনে সীমিত সরবরাহের কারণে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল দেওয়ায় ছোট পরিবহনগুলো বঞ্চিত হচ্ছে। এই বৈষম্য দূর করার দাবি জানান
তিনি।
এদিকে ফুয়েল স্টেশন মালিকরা জানান, সরবরাহ কম থাকায় তারা চাপের মধ্যে রয়েছেন। সাতক্ষীরার এবিখান ফুয়েল স্টেশনের ম্যানেজার কাজী শুভ্র জানান, আগে স্টেশনে পর্যাপ্ত ডিজেল মজুত থাকলেও এখন তেল আসার পরপরই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ডিপো থেকে কম বরাদ্দ পাওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে
না।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে,জেলায় ডিজেলের সরবরাহ কিছুটা কম থাকলেও কোনো কৃত্রিম সংকট নেই। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে এবং কোথাও তেল মজুত বা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।