পটুয়াখালী শহরে দ্রুত বিস্তার ঘটছে লাইসেন্সবিহীন মাংস বিক্রির দোকানের, যা এখন জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও ধর্মীয় বিধান- সব দিক থেকেই বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট আইন ও নিয়ম-কানুন উপেক্ষা করে পরিচালিত এসব মাংসের দোকান কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে ঝুঁকি।
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, শহরে মাত্র ১৬ জন ব্যবসায়ীর ট্রেড লাইসেন্স থাকলেও পশু জবাই ও মাংস বিক্রির জন্য নির্ধারিত বিশেষ লাইসেন্স কিংবা স্বাস্থ্যসনদ কারও নেই। অর্থাৎ অধিকাংশ ব্যবসা সম্পূর্ণ অনিয়মের মধ্যেই পরিচালিত হচ্ছে।
শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খোলা জায়গায় পশু জবাই করা হচ্ছে। ব্যবহৃত হচ্ছে অপরিষ্কার পানি, নেই কোনো সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। চারপাশে মাছি ও পোকামাকড়ের উপস্থিতিতে মাংস বিক্রি করা হচ্ছে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠেছে। এতে করে ডায়রিয়া, খাদ্যবাহিত সংক্রমণসহ নানা রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
আইন অনুযায়ী লাইসেন্স ছাড়া পশু জবাই ও মাংস বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পাশাপাশি নির্ধারিত জবাইখানা, স্বাস্থ্যসনদ, পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্রে দেখা যাচ্ছে, এসব নিয়মের কোনো প্রতিফলন নেই অধিকাংশ বাজারে।
ধর্মীয় দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। ইসলামি বিধান অনুযায়ী পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম, পরিচ্ছন্নতা ও হালাল পদ্ধতি অনুসরণ করা অত্যাবশ্যক। পটুয়াখালী পৌরসভার উদ্যোগে নিউমার্কেট এলাকায় একজন মৌলভী নির্ধারিত থাকলেও অনেক ব্যবসায়ী সেই নিয়ম অনুসরণ করছেন না বলে জানা গেছে।
এদিকে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে ফ্রিজজাত মাংস নিয়ে অভিযোগ। অনেক অসাধু ব্যবসায়ী রাতের আঁধারে ভিন্ন জেলা থেকে সংরক্ষিত মাংস এনে তা তাজা বলে বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি চোরাই পশু জবাইয়ের ঘটনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এতে ভোক্তারা প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
পরিবেশগত দিক থেকেও পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক। খোলা জায়গায় পশু জবাইয়ের ফলে রক্ত ও বর্জ্য আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় এসব বর্জ্য সরাসরি নালা ও খালে গিয়ে পড়ছে, যা পানিদূষণসহ পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এ বিষয়ে পৌর স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাক্তার একরামুল কবির নাহিদ বলেন, শহরের অধিকাংশ মাংস বিক্রেতার মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। অনেকেই প্রয়োজনীয় মেডিকেল সনদ ছাড়াই এই পেশায় যুক্ত থাকায় জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তিনি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
পৌর স্যানিটারি কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা বলেন, অপরিকল্পিতভাবে পশু জবাই ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে শহরের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নির্ধারিত জবাইখানা ব্যবহার না করে যত্রতত্র পশু জবাই করা স্বাস্থ্যসম্মত নয় এবং এটি পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ।
জেলা ইমাম পরিষদের সভাপতি মাওলানা আবু সাঈদ বলেন, ইসলামে পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা, হালাল পদ্ধতি ও স্বাস্থ্যবিধি মানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই এসব নির্দেশনা মানা হচ্ছে না, যা দুঃখজনক এবং সংশ্লিষ্টদের সচেতন হওয়া জরুরি।
জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মো. হাবিবুর রহমান বলেন, আইন অনুযায়ী পশু জবাইয়ের আগে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং অনুমোদিত স্থানে জবাই নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এসব নিয়ম না মানায় রোগাক্রান্ত পশুর মাংস বাজারে চলে আসার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক।
এ অবস্থায় ভোক্তারা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, লাইসেন্স নিশ্চিতকরণ, স্বাস্থ্য সনদ বাধ্যতামূলক করা এবং অবৈধ মাংস বিতান বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন তারা।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিবেশ রক্ষা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে এখনই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।