সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) চার শিক্ষার্থীর উপর ছাত্রদলের হামলার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করেছে শিক্ষার্থীরা। সংবাদ সম্মেলনে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ ও ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধসহ সাত দফা দাবি জানিয়েছে তারা। পাশাপাশি দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস, ল্যাব ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের সামনে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে হামলার শিকার ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, মো. এহসানুল হক রাফি, রাইয়ান সিদ্দিকী পর্ব ও মাহিন জামান উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।
বৃস্পতিবার (৬ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের পকেট গেট সংলগ্ন রাস্তায় চারজন শিক্ষার্থীকে বুটেক্স ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা-কর্মীর মারধরের অভিযোগ উঠে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, ৪৮তম ব্যাচের ফ্যাব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল বুটেক্স শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক বর্ষণ বণিক, ৪৯তম ব্যাচের অ্যাপারেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল বুটেক্স শাখার দপ্তর সম্পাদক মাজেদুল ইসলাম প্রান্ত, একই ব্যাচের ও বিভাগের শিক্ষার্থী সুমন সরকার ও ৪৯তম ব্যাচের ইয়ার্ণ ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দেবনাথ সৌমিক চন্দ্রসহ অন্যান্যরা মারধরে সম্পৃক্ত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী মিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং ঘটনার সময় তার সঙ্গে থাকা সহপাঠী তাসনিম আনোয়ার ও এস এম সাদিকুজ্জামান বক্তব্য দেন। সংবাদ সম্মেলনে ৪৯তম ব্যাচের ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী তাসনিম আনোয়ার বলেন, ‘বুটেক্সে আনুষ্ঠানিকভাবে সব ধরনের ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও একটি গোষ্ঠী রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ৫ আগস্ট হলে মিষ্টি বিতরণের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করায় পরদিন ক্লাস ও ল্যাব শেষে ফেরার সময় পকেট গেটের সামনে মিরাজুলের ওপর হামলা করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ছাত্রদলের পরিচয়ধারী কয়েকজন মিরাজুলকে এলোপাতাড়ি ঘুষি ও লাথি মারেন। এ সময় ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে গেলে তাদের সহপাঠী রাইয়ান সিদ্দিকী পর্বের ওপরও হামলা করা হয় এবং তার চশমা ভেঙে দেওয়া হয়। তার চোখ ও মুখে আঘাত লাগে।’
ঘটনার পর উপাচার্য, প্রক্টর ও হল প্রভোস্টের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা জানিয়ে তাসনিম বলেন, ‘ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ চাইলেও প্রশাসন তা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। একদিকে রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপাচার্যের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করছেন, হলে সিট দখল করছেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি চালাচ্ছেন।’
সংবাদ সম্মেলনে হামলার শিকার মিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে সম্প্রতি গণস্বাক্ষর কর্মসূচি আয়োজন করেছি। এতে এখন পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ১০০ শিক্ষার্থীর স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। বুটেক্সের অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখনো ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের রাজনীতি চায় না। আমরা এই গণস্বাক্ষর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দেব।’
এ সময় শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সাত দফা দাবি তুলে ধরেন ৪৯তম ব্যাচের ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী এস এম সাদিকুজ্জামান। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে হামলার মূল অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের ছাত্রত্ব দ্রুত বাতিল, হামলায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিদের অন্তত দুই বছরের জন্য বহিষ্কার ও ঘটনার সত্যতা উদঘাটনে ঘটনাস্থলের সম্পূর্ণ সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করা ইত্যাদি।
এ ছাড়া নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে প্রক্টর ড. মো. মাহবুবুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদত্যাগ, ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা এবং রাজনৈতিক কমিটিতে থাকা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের আরও দাবি, উপাচার্যের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এসব দাবির বাস্তবায়ন ও হামলার সুষ্ঠু বিচার না হওয়া পর্যন্ত বুটেক্সের সব ব্যাচের ক্লাস, ল্যাব ও পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য বর্জনের ঘোষণাও দেন তারা।
এর আগে, বৃহস্পতিবার অভিযোগের ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের জন্য চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অফিস আদেশ অনুযায়ী, উক্ত কমিটিকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন প্রক্টর বরাবর জমা দিতে বলা হয়েছে।