ভারতের আসাম রাজ্যে বন্যায় যখন চারদিকে শুধু পানি আর পানি, তখন কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ বা মোটরচালিত নৌকা ছাড়াই প্রায় দুই হাজার মানুষের প্রাণ বাঁচিয়ে আলোচনায় এসেছেন শ্রবণ কুমার।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতি বর্ষায় নদীতে ভেসে আসা গাছের গুঁড়ি সংগ্রহ করতে নদীর তীরে যান শ্রবণ। এগুলো বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়ে পরিবারের খরচ চলে। পাশাপাশি রান্নার জ্বালানিও জোগাড় হয়, কারণ তাদের বাড়িতে এলপিজি সিলিন্ডারের সংযোগ নেই।
ঘটনার দিন অর্থাৎ ১৯ জুলাই রাত ৩টার দিকে যথারীতি আসামের বিহুবর এলাকার দিখৌ নদীর তীরে গিয়েছিলেন ২৫ বছরের এই তরুণ। তিনি তখনও জানতেন না, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাকে এ মৌসুমের অন্যতম বড় উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্ব দিতে হবে।
সেদিন নদীর হাবভাব ছিল অন্য রকম। প্রবল স্রোতে বিশাল বিশাল গাছের গুঁড়ি ভেসে আসতে দেখে দিখৌ নদীর তীরে বেড়ে ওঠা শ্রবণ বুঝতে পারেন, বড় ধরনের বিপদ আসছে।
ভোর হতে না হতেই তার আশঙ্কা সত্যি হয়। বন্যার পানি দ্রুত আশপাশের এলাকা প্লাবিত করতে শুরু করে। শ্রবণের নিজের বাড়িও রেহাই পায়নি।
বন্যার পানি ঘরে ঢুকে পড়ায় তার মা ও ভাই তাড়াতাড়ি করে বাড়ির জিনিসপত্র উঁচু জায়গায় সরিয়ে নেন।
এমন পরিস্থিতিতে শ্রবণের নিজের পরিবারের কাছে ছুটে যাওয়াই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি তা না করে বন্যাকবলিত মানুষদের উদ্ধারে নেমে পড়েন।
শ্রবণ বলেন, ‘আমি যদি নিজের বাড়ি বাঁচাতে ফিরে যেতাম, তাহলে অন্যদের উদ্ধারের জন্য কেউ থাকত না।’
এনডিটিভি জানিয়েছে, দশম শ্রেণিতে ঝরে পড়া এই তরুণের কোনো উদ্ধার প্রশিক্ষণ নেই। এমনকি সেদিন তার কাছে মোটরচালিত নৌকাও ছিল না।
তিনি ভরসা করেছিলেন নদী সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয়ভাবে ‘তুলুঙ্গা নাও’ নামে পরিচিত একটি ঐতিহ্যবাহী কাঠের নৌকার ওপর।
সেদিন কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে শ্রবণ এমনসব এলাকায় উদ্ধার অভিযানে যান, যেখানে যেতে অভিজ্ঞ মাঝিরাও ভয় পাচ্ছিলেন।
সকাল ১০টা থেকে শুরু করে সারারাত এবং পরদিন পর্যন্ত তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যান। ডুবে যাওয়া বাড়ি থেকে শিশুদের বের করে আনা, চলাফেরা করতে অক্ষম বয়স্কদের নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া এবং পানি বাড়তে থাকায় ছাদে আটকে পড়া গর্ভবতী নারী এবং অসুস্থ মানুষদের উদ্ধার করেন তারা।
শ্রবণ বলেন, ‘অনেকে ঘরের ছাদ ও সিলিংয়ের মাঝের ফাঁকা জায়গায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখান থেকে তাদের বের করে আনতে হয়েছে। রাতের অন্ধকারে উদ্ধার অভিযান চালানো সত্যিই কঠিন ছিল।’
উদ্ধার অভিযান শেষে শ্রবণের ধারণা, তিনি ও তার বন্ধুরা পাঁচটি গ্রামের প্রায় দুই হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে সক্ষম হন।
এদিকে আসামের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গতকাল শনিবার রাজ্যটিতে বন্যাকবলিত মানুষের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৮ হাজারে।
গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে বন্যায় নতুন করে প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। ফলে এতে মৃত্যুর সংখ্যা ৮২-তেই রয়েছে।