সিএনএনের প্রতিবেদন
তেহরানে গত সপ্তাহে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মরদেহের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। সেসময় কালো পোশাক পরা শোকার্তদের একাংশ প্রয়াত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পরিবর্তে সরাসরি প্রেসিডেন্টের উদ্দেশে স্লোগান দেয়, ‘আপসকারীর মৃত্যু হোক।’
সেসময় খানিকটা দূরে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে আলোচনা এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে ভূমিকা রাখা ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক আব্বাস আরাগচিকে প্রয়াত নেতার শেষবিদায়ের অনুষ্ঠান থেকে সরে যেতে হয়।
কারণ উপস্থিত জনতার একাংশ তাকে ‘দেশদ্রোহী’ ও ‘বিক্রি হয়ে যাওয়া ব্যক্তি’ বলে চিৎকার করতে করতে পাথর ছুড়ে মারেন।
শেষবিদায়ের অনুষ্ঠানে ইরানের নেতৃত্বের প্রতি এমন ক্ষোভ ও বৈরী আচরণ মূলত একটি তত্ত্বকে সামনে এনেছে, যা গত কয়েক মাস ধরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে কট্টরপন্থী মহলে ডালপালা মেলে।
তত্ত্বটি হলো, ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে আলোচনা ও স্বাক্ষরকারী ইরানের যুদ্ধকালীন নেতারা আসলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র এবং এর বিপ্লবী আদর্শের বিরুদ্ধে ‘নরম অভ্যুত্থান’ (সফট ক্যু) ঘটাচ্ছেন।
এই সুযোগটি তারা নিচ্ছেন, কারণ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছেলে ও ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি জীবননাশের আশঙ্কায় জনসম্মুখে একেবারেই আসছেন না।
খামেনির জানাজায় বিপুল সংখ্যায় অংশ নেওয়া কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বিশ্বাস, প্রয়াত নেতা হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার পরিবর্তে ইরানি নেতৃত্ব এমন এক চুক্তিতে সই করে ‘আত্মসমর্পণ’ করেছেন, যা নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ‘নির্দেশের পরিপন্থী’।
কট্টরপন্থীদের অভিযোগ, মোজতবা খামেনির এই অনুপস্থিতির সুযোগে প্রতিনিধিত্বকারী দৃশ্যমান নেতৃত্ব পার্লামেন্ট স্থগিত করে শান্তি আলোচনায় তার নির্দেশ অমান্য করে এবং কট্টরপন্থীদের মূল শক্তিকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ইরানের রাজপথে রাতের বেলার সমাবেশগুলো ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চক্রান্ত করছে।
খামেনির শেষকৃত্যের কয়েক দিন আগে ইরানের কট্টরপন্থী ও স্পষ্টভাষী আইনপ্রণেতা মাহমুদ নাবাবিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রশ্ন তোলেন, ‘ইরানের জনগণের জন্য সতর্কবার্তা: দেশে কি কোনো অভ্যুত্থান ঘটতে যাচ্ছে??’
এর কয়েকদিন পর তিনি আবার লেখেন, ‘শহীদ ইমামের (খামেনি) বিদায়ের এই মুহূর্তে আমরা প্রতিশোধের পতাকা ওড়াচ্ছি এবং এই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াচ্ছি।’
মোজতবার অনুপস্থিতিতে প্রধান মধ্যস্থতাকারী গালিবাফ, পেজেশকিয়ান ও আরাগচি-ই এখন যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানের সবচেয়ে দৃশ্যমান ও প্রভাবশালী মুখ।
যুক্তরাষ্ট্রের ইরান বিশেষজ্ঞ ও ‘হোয়াট ইরানিয়ানস ওয়ান্ট’ বইয়ের লেখক আরশ আজিজি সিএনএনকে বলেন, নতুন সর্বোচ্চ নেতার সান্নিধ্য না পেয়ে ক্ষুব্ধ কট্টরপন্থীরা এখন গালিবাফদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের অভিযোগ তুলছেন।
আজিজি বলেন, “মোজতবার দীর্ঘ অনুপস্থিতির অর্থ, কট্টরপন্থীরা তার কাছে পৌঁছাতে পারছেন না এবং কার্যত গালিবাফ ও তার সহযোগীরাই দেশ চালাচ্ছেন। ফলে চরম কট্টরপন্থীরা এখন গালিবাফ ও পেজেশকিয়ানের বিরুদ্ধে মোজতবার শাসন উৎখাতে ‘অভ্যুত্থান’ ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছেন।”