মানুষ হয়তো ভুলে যায়, ক্ষমাও করে দেয়। কিন্তু কাক তা করে না। শুধু তাই নয়, কারও প্রতি ক্ষোভ জন্মালে তারা সেটি নিজেদের সঙ্গী ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে দিতে পারে।
কানাডার ভ্যাঙ্কুভারের বাসিন্দা লিসা জয়েস একবার রাস্তায় হাঁটার সময় কাকের হামলার শিকার হয়েছিলেন। কাকগুলো বারবার নিচে নেমে তার মাথায় আঘাত করে আবার উড়ে যাচ্ছিল। একবার নয়, আট আটবার তাকে আক্রমণ করা হয়।
এ ধরনের ঘটনা এত ঘন ঘন ঘটতে থাকে যে, শেষ পর্যন্ত কাক এড়াতে তাকে কর্মস্থলে যাওয়ার পথই বদলে ফেলতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের বাসিন্দা নিল ডেভও একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, কাকগুলো তার বাড়িতে এসে কাচের দরজায় ঠোঁট দিয়ে এমন জোরে আঘাত করত যে তার মনে হতো, দরজার কাচ বুঝি ভেঙেই যাবে।
জয়েস বা ডেভ একা নন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অনেকেই কাকের এমন হামলার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন, যে পাখিটিকে সাধারণত নিরীহ বলেই মনে করা হয়।
গাড়ির আয়না থেকে শুরু করে মানুষের মাথা, যা-ই লক্ষ্যবস্তু বানায়, শক্ত ঠোঁট দিয়ে তা ক্ষতিগ্রস্ত করতে কাকের জুড়ি নেই।
প্রথমে মনে হতে পারে, কাকগুলো হয়তো হঠাৎ করে কাউকে আঘাত করছে। কিন্তু গবেষকদের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি ইচ্ছাকৃত সিদ্ধান্ত। আর সেটি নেওয়ার মতো বুদ্ধিমত্তাও তাদের রয়েছে।
অসাধারণ বুদ্ধিমান পাখি
কাককে পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান পাখিগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। তবে তাদের সক্ষমতা কেবল বুদ্ধিমত্তাতেই সীমাবদ্ধ নয়।
কাক মানুষের কথার অনুকরণ করতে পারে, বিভিন্ন কাজের জন্য সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারে এবং ভিড়ের মধ্য থেকেও নির্দিষ্ট মুখ চিনে রাখতে ও বহু বছর মনে রাখতে পারে।
এমনকি তাদের দলের কোনো সদস্য মারা গেলে বা নিহত হলে অন্য কাকেরা একত্রিত হয়। অনেক গবেষকের মতে, এটি এক ধরনের ‘শেষকৃত্যের আচার’।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ক্ষোভ
অসাধারণ মানসিক শক্তির কারণে কাক দীর্ঘদিন ক্ষোভও ধরে রাখতে পারে। কোনো ব্যক্তি তাদের কাছে বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত হলে পুরো কাকের দল তার বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই শত্রুতা শুধু একটি কাকের জীবনকালেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সাধারণত একটি কাক ১০ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত বাঁচে, কিন্তু মানুষের প্রতি তাদের নেতিবাচক ধারণা পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ফলে একই ব্যক্তিকে বছরের পর বছর কাকের আক্রমণের মুখে পড়তে হতে পারে।
পিছু নেওয়ার স্বভাব
কাক কি অকারণেই কাউকে শত্রু মনে করে, নাকি এর পেছনে কারণ থাকে?
যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলের কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ জিন কারটার দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, প্রায় এক বছর ধরে কাক তার পিছু নিয়েছিল।
তিনি জানান, কাকগুলো তার রান্নাঘরের জানালার বাইরে বসে তাকিয়ে থাকত, গাড়ির দিকে হাঁটলে মাথার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ত, এমনকি পথেও তাকে অনুসরণ করত।
এর কারণ কী ছিল?
কারটার একবার দেখেছিলেন, কয়েকটি কাক একটি রবিন পাখির বাসা দখলের চেষ্টা করছে। সেগুলো তাড়াতে তিনি একটি রেক (মাটি বা পাতা সরানের যন্ত্র) আকাশের দিকে ছুড়ে মারেন।
সে ঘটনার পর থেকেই কাকগুলো তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে।
কারটারের ভাষ্য, ‘প্রতিদিন বাসস্টপে তারা আমার জন্য অপেক্ষা করত। বাসস্টপ থেকে আমার বাড়ি তিন-চার ব্লক দূরে ছিল। পুরো পথে তারা আমাকে আক্রমণ করত।’
বাধ্য হয়ে ঠিকানা বদলের পরই এই অত্যাচার থেকে রেহাই পেয়েছিলেন কারটার।