ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন রেখে মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প (যার একটি ৭ দশমিক ২, অন্যটি ৭ দশমিক ৫ মাত্রার) আঘাত হানার পর গতকাল বুধবার রাতে ভেনেজুয়েলাজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।
ভূমিকম্পের তীব্রতায় একের পর এক ভবন ধসে পড়ে। মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দিগ্বিদিক ছোটে।
ভেনেজুয়েলায় উদ্ধারকারী দলগুলো যখন ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষকে বাঁচাতে গতকাল রাত থেকে কাজ করে যাচ্ছে, তখন মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) সতর্ক করে বলেছে, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং বিপুল সংখ্যক মানুষের হতাহত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংস্থাটির সর্বশেষ মূল্যায়ন বলছে, এই দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার থেকে ১০ হাজারের মধ্যে হওয়ার আশঙ্কা ৩৯ শতাংশ। এটি এক লাখ পর্যন্ত স্পর্শ করার আশঙ্কা রয়েছে ৩৭ শতাংশ।
বুধবার ভূমিকম্প যখন আঘাত হানে, তখন ভেনেজুয়েলার অনেক মানুষই বাড়িতে ছিলেন। স্প্যানিশ শাসন থেকে ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতা যুদ্ধের ঐতিহাসিক বিজয়ের (১৮২১ সালের কারাবোবো যুদ্ধ) স্মরণে এদিন দেশটিতে সরকারি ছুটি ছিল।
এর আগে ১৯৬৭ সালে ভেনেজুয়েলায় ৬ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্পে ২ শতাধিক মানুষ নিহত হন। সেসময়ও বহু ভবন ধসে পড়ে।
তবে ১৯৬৭ সালের সেই ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা যাদের আছে, তাদের মতে, বুধবারের কম্পনটি ছিল আরও অনেক বেশি শক্তিশালী।
প্রশ্ন উঠেছে, ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা ভূমিকম্প এত বিধ্বংসী হয় কেন?
টেকটোনিক প্লেটের টানাপোড়েন
ভেনেজুয়েলা কেন এত বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হলো, তা বুঝতে হলে দেশটির ভৌগোলিক কাঠামোর দিকে তাকাতে হবে।
ভেনেজুয়েলা মূলত দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর উপকূলে অবস্থিত। দেশটির মূল ভূখণ্ডের সিংহভাগ সাউথ আমেরিকান প্লেটের ওপর নিরাপদ অবস্থানে থাকলেও এর উত্তর উপকূল এবং ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জগুলো সরাসরি ক্যারিবীয় প্লেট ও সাউথ আমেরিকান প্লেটের সংযোগস্থলের ওপর অবস্থিত।
এই অত্যন্ত সক্রিয় সীমানায় প্লেট দুটি একে অপরের সঙ্গে ঘর্ষণ ও ধাক্কা খাচ্ছে। এই জটিল ভূ-তাত্ত্বিক বিন্যাসের কারণে ওই অঞ্চলের ভূত্বক প্রতিনিয়ত প্রচণ্ড চাপের মধ্যে থাকে।
প্রকৃতপক্ষে ভেনেজুয়েলার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ এই সক্রিয় ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে বসবাস করেন, যা বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
মাটির নিচের এই তীব্র চাপ সাধারণত বড় বড় ফল্ট সিস্টেম বা ভূ-ফাটলের মাধ্যমে নির্গত হয়; যার মধ্যে অন্যতম হলো বোকোনো ফল্ট। শক্তিশালী ভূমিকম্পের জন্ম দেওয়ার জন্য এই ফাটলটি কুখ্যাত।
প্লেটের এই স্থানচ্যুতির একটি ধারণা দিতে গবেষকেরা জানান, সাউথ আমেরিকান প্লেটের চেয়ে ক্যারিবীয় প্লেটটি প্রতি বছর প্রায় ২০ মিলিমিটার করে পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা আরও জানতে পেরেছেন, কাছের ত্রিনিদাদ দ্বীপের কেবল একটি সক্রিয় ভূ-ফাটলই এই তীব্র ভূ-কম্পন গতির প্রায় ৭০ শতাংশ চাপ সামাল দেয়।
অগভীর ভূমিকম্পের বিপদ
ভেনেজুয়েলার এই ভূ-কম্পন এত বেশি ধ্বংসাত্মক হওয়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো, এর গভীরতা। এখানকার অধিকাংশ ভূমিকম্পই অগভীরকেন্দ্রিক; যার অর্থ, এগুলো ভূপৃষ্ঠের মাত্র ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটারের চেয়েও কম গভীরতায় উৎপন্ন হয়।
একই মাত্রার একটি গভীর ভূমিকম্পের চেয়ে অগভীর ভূমিকম্প ভূপৃষ্ঠে অনেক বেশি বিপজ্জনক এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সৃষ্টি করে।
যেহেতু এই ভূমিকম্পগুলো আমাদের পায়ের ঠিক নিচেই ঘটে, তাই এর ধ্বংসাত্মক ভূ-কম্পন তরঙ্গ শহর ও জনপদে আঘাত হানার আগে দুর্বল হওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় বা দূরত্ব পায় না।