কয়েক মাস আগের কথা। সমবয়সী আর দশটা তরুণ যখন অধীর আগ্রহে কলেজে ভর্তির ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, জীবনের পরবর্তী অধ্যায় নিয়ে পরিকল্পনায় ব্যস্ত ছিলেন, আলী রাজার মনোযোগ তখন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছুতে।
সেসময় নিজের একটি কিডনি দান করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ১৮ বছরের এই তরুণ। তার কিডনির গ্রহীতা অপরিচিত কেউ নন; স্বয়ং তার বাবা।
৪৯ বছর বয়সী আবিদ রাজার দুটি কিডনিই আর কাজ করছিল না। চিকিৎসকদের ভাষ্য, তার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার একমাত্র উপায় কিডনি প্রতিস্থাপন।
চিকিৎসকের পরামর্শ শুনে আবিদ তখন তার পরিবারের সদস্যদের মধ্য থেকে উপযুক্ত দাতার সন্ধান শুরু করেন। আশা ছিল, কারও না কারও সঙ্গে মিল পাওয়া যাবে।
দুর্ভাগ্যবশত, কারও কিডনিই মিলল না।
আলী দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, ‘আমিই ছিলাম বাবার শেষ ভরসা। বাবার জীবন বাঁচাতে নিজে দাতা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিতীয়বার ভাবিনি। তিনি আমাকে এই পৃথিবীতে এনেছেন। আমি তাকে কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ বেছে নিয়েছি।
‘তবে এখানে আরেকটি বড় বাধা ছিল। আমাদের রক্তের গ্রুপ আলাদা। চিকিৎসকদের ভাষায় একে বলে এবিও-ইনকম্প্যাটিবল ট্রান্সপ্ল্যান্ট। এটি এমন এক প্রক্রিয়া, যার জন্য সাধারণ কিডনি প্রতিস্থাপনের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়।’
ভারতের দিল্লির পাটপড়গঞ্জের ম্যাক্স সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের ইউরোলজি ও কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক ডা. পরেশ জৈন এই প্রতিস্থাপন দলের নেতৃত্ব দেন।
তিনি জানান, দুটি কারণে এই ঘটনা ব্যতিক্রমী ছিল। প্রথমত, রক্তের গ্রুপের অমিল। দ্বিতীয়ত, আবিদের কিডনি বিকল হওয়ার কারণ ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো সাধারণ কোনো রোগ ছিল না; বরং এটি হয়েছিল বিরল এক অটোইমিউন রোগের কারণে।
এসব জটিলতার কারণে চিকিৎসকদের দলটিকে প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিকল্পনা করতে হয়।
পরেশ বলেন, ‘কয়েক দশক আগেও রক্তের গ্রুপ না মিললে পরিবারের মধ্যে কিডনি প্রতিস্থাপন অসম্ভব বলে ধরে নেওয়া হতো। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি সেই ধারণা বদলে দিয়েছে।
‘এ ধরনের ঘটনা সামনে আনার মূল উদ্দেশ্য মানুষকে সচেতন করা, যাতে তারা মনে না করেন, কেবল রক্তের গ্রুপ মিললেই কিডনি প্রতিস্থাপন সম্ভব।’
‘আজকাল এবিও-ইনকম্প্যাটিবল, এমনকি এইচএলএ-ইনকম্প্যাটিবল ট্রান্সপ্ল্যান্টও (যেখানে গ্রহীতার দেহ দাতার অঙ্গকে সহজে গ্রহণ করতে চায় না, কিন্তু চিকিৎসকেরা বিশেষ উপায়ে সেই ঝুঁকি দূর করে প্রতিস্থাপন সফল করেন) সফলভাবে হচ্ছে। পরিবারগুলোর জানা উচিত, এই বিকল্প চিকিৎসাগুলো এখন বিদ্যমান,’ যোগ করেন এই চিকিৎসক।
চিকিৎসকদের আশা, একটি কিডনি নিয়েই বহু বছর বেঁচে থাকবেন আলী।
তারা জানান, কিডনি দেওয়ার আগে নিখুঁত শারীরিক পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্যই ছিল এটি নিশ্চিত করা, যাতে একটি কিডনি নিয়ে আলী নিজে যেমন সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারেন, তেমনই তার দেওয়া কিডনিটি যেন গ্রহীতার (বাবা) শরীরেও সর্বোচ্চ কার্যকর হয়।
কিডনি প্রতিস্থাপন শেষ পর্যন্ত সফল হয়। অস্ত্রোপচারের চার দিন পরে আলীকে ছাড়পত্র দেয় হাসপাতাল।
অস্ত্রোপচারের আগে আলী খেলাধুলা ও শারীরিক কসরত করতে ভীষণ পছন্দ করতেন। তবে শরীর পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আপাতত সেসব কর্মকাণ্ড বন্ধ রয়েছে।
আলী বলেন, ‘আমি এখন খেলাধুলা করতে পারছি না ঠিকই, তবে আমি আমার শরীরের যত্ন নিতে শিখেছি। নিজের শরীরের প্রতি আমাকে কতটা দায়িত্বশীল হতে হবে, তা এখন বুঝতে পারছি।’