ব্যাংককের খাওসান রোড, শহরটির অন্যতম ব্যস্ত এক এলাকা, যা মূলত ব্যাকপ্যাকারদের (কম খরচে ভ্রমণকারী) কাছে ভীষণ জনপ্রিয়। পড়ন্ত বিকেলে দেখা যায়, পানশালার কর্মীরা পথচারীদের নানা অফার দিয়ে ভেতরে ডাকার চেষ্টা করছেন। চারদিকে গাঁজার গন্ধ, শহরটিতে যা এখন বেশ সহজলভ্য। রাস্তার পাশের বিক্রেতারা নকল ট্যাটু, ফ্লিপ-ফ্লপ থেকে শুরু করে ফলের জুসসহ নানা পসরা সাজিয়ে বসেছেন।
কয়েক দশক ধরেই এই রাস্তা এবং এর কোলাহলপূর্ণ রাতের জীবন বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের আকর্ষণ করে আসছে। তবে থাইল্যান্ডের সাধারণ মানুষ এখন এসব উৎসবপ্রেমী দর্শনার্থীর লাগামহীন আচরণে ক্রমশ বিরক্ত হয়ে উঠছেন। থাই ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করা সোশ্যাল মিডিয়া চ্যানেল থাই’ড আপ উইথ মিনির পরিচালক মিনির মতে, অনেকে মনে করেন থাইল্যান্ড একটি ‘খেলার মাঠ’, এখানে যা খুশি করা যায়।
ভিসা নিয়মে কড়াকড়ি
আতিথেয়তার জন্য বিশ্বজোড়া খ্যাতি থাকা সত্ত্বেও থাইল্যান্ড সরকার এবার একটি সীমারেখা টানার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত মাসে দেশটির সরকার ঘোষণা দিয়েছে, তারা ভিসা নিয়মে কড়াকড়ি আরোপ করবে। এর আওতায় ৯০টিরও বেশি দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসামুক্ত অবস্থানের মেয়াদ ৬০ দিন থেকে কমিয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০ দিন করা হবে। তবে নতুন এই নিয়ম ঠিক কবে থেকে কার্যকর হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সরকারের এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছেন থাইল্যান্ডের অনেক সাধারণ মানুষ। পর্যটকদের অসদাচরণে তারা রীতিমতো অতিষ্ঠ। রেস্তোরাঁর বিল না দেওয়া, রাস্তায় মদ্যপ অবস্থায় মারামারি কিংবা টুকটুকের ভেতর বিদেশি যুগলদের যৌনতায় লিপ্ত হওয়ার মতো খবর ও ভিডিও সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছে। এমনকি স্থানীয়দের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের প্রমাণও মিলেছে ভিডিওতে। একটি ঘটনায় দেখা যায়, এক বিদেশি পর্যটক রাস্তার পাশের এক খাবার বিক্রেতার দিকে নাকের সর্দি ছুড়ে দিচ্ছেন।
মিনি বলেন, ‘থাইল্যান্ডের নাগরিকরা এসব আচরণে এতটাই বিরক্ত যে ইতোমধ্যে তারা এসবের জোরালো প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করেছেন। তারা এখন বুঝতে শুরু করেছেন, আমরা এ ধরনের আচরণ চাই না। এটি এখানে বসবাসরত সাধারণ মানুষের জন্য মোটেও সুখকর নয়।’
স্থানীয়দের এই ক্ষোভ সরকারের নজরেও এসেছে। সরকারও ইতোমধ্যে অসদাচরণকারী পর্যটকদের সতর্ক করেছে। চলতি মাসের শুরুতে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব আরসিত সাম্পান্থারাত বলেন, ‘থাইল্যান্ডে প্রবেশ করে বিদেশিরা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির মতো আচরণ করতে পারবেন না। তারা কোনো বেআইনি কাজ, স্থানীয়দের হয়রানি বা থাইল্যান্ডের নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিপন্থী কোনো আচরণ করতে পারবেন না।’
কেবল পর্যটকদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণই নয়, বিদেশিদের অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা বা ভিসা নিয়মের ফাঁকফোকর গলিয়ে দেশটিকে আন্তর্জাতিক অপরাধের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করার আশঙ্কাও থাইল্যান্ডকে ভাবিয়ে তুলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সাইবার অপরাধ ও প্রতারণামূলক চক্রের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। পাচারকারীরা প্রায়ই মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের থাইল্যান্ড হয়ে মিয়ানমারের মতো প্রতিবেশী দেশে নিয়ে যায়।
শৃঙ্খলা বনাম অর্থনীতি
অন্যদিকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেও সরকার শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও দেশের অর্থনীতির মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। থাইল্যান্ডের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে বিদেশি পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল। দেশটির জিডিপির প্রায় ২০ শতাংশই আসে পর্যটন খাত থেকে, যা বিলাসবহুল হোটেল-স্পা থেকে শুরু করে খাবার বিক্রেতা ও ট্যাক্সিচালকদের কর্মসংস্থানেরও প্রধান চালিকাশক্তি। তবে পর্যটন এলাকায় বিদেশিদের অবৈধ ব্যবসা ও জমি দখলের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে অভিযান শুরু করেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ইমিগ্রেশন ব্যবস্থায় আরও কড়াকড়ির দাবি জানিয়েছে।
পাতায়া বিজনেস অ্যান্ড ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি চুতিমা জিরামংকল বলেন, ‘আমাদের উদ্বেগের জায়গাটি প্রকৃত পর্যটকদের নিয়ে নয়, বরং যারা ট্যুরিস্ট ভিসায় এসে অবৈধভাবে ব্যবসা ফেঁদে বসে, তাদের নিয়ে।’
তিনি মনে করেন, ভিসা আইন কঠোর হলে পর্যটকদের আরও ভালোভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে। বেশির ভাগ পর্যটক যেহেতু খুব বেশি দিনের জন্য আসেন না, তাই এর নেতিবাচক প্রভাব তেমন পড়বে না। থাই সরকারের মুখপাত্র রাচাদা ধনাদিরেকও বলেন একই কথা। তার মতে, ‘বর্তমান ব্যবস্থায় এমন একটি ফাঁকফোকর তৈরি হয়েছিল, যা কাজে লাগিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যের মানুষেরা ফায়দা লুটছিল।’
অবশ্য ভিসা সংক্রান্ত নতুন পরিবর্তনের ঘোষণা দেওয়ার সময় কর্মকর্তারা ‘জাতীয় নিরাপত্তার’ কথা উল্লেখ করলেও এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
পর্যটকদের প্রতিক্রিয়া ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন
ব্যাংককের অন্যতম বিখ্যাত মন্দির ওয়াট অরুণের বাইরে সারি সারি টুকটুক যাত্রীদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এটি থাইল্যান্ডের জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী তিন চাকার মোটরচালিত অটোরিকশা। সেখানে অনেক পর্যটকেরই মত, ইমিগ্রেশন নিয়মে পরিবর্তনের কারণে তাদের ছুটির পরিকল্পনায় খুব একটা প্রভাব পড়বে না। পরিবার নিয়ে থাইল্যান্ড ঘুরতে আসা হুয়ান লুনা জানান, চার দিনের জন্য এলেও নতুন নিয়মে ভ্রমণের জন্য যথেষ্ট সময় পাওয়া যাবে।
তবে হাঙ্গেরি থেকে আসা রুডলফ গুজসালি অন্তত ছয় সপ্তাহ থাকার পরিকল্পনা করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি বিষয়টি বুঝতে পারছি, কারণ পর্যটকদের নিয়ে এখন অনেক সমস্যা হচ্ছে। তবে বেশির ভাগ পর্যটকই দুই সপ্তাহের জন্য আসে। তাই কেউ যদি সমস্যা তৈরি করতে চায়, সে দুই সপ্তাহের মধ্যেই তা করতে পারে।’
তবে মিনির মতো অনেকেই আশা করছেন, ভিসার এই নতুন নিয়ম থাইল্যান্ডের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগুলো রক্ষায় সাহায্য করবে। থাই সংস্কৃতিতে সাধারণত অন্যকে সম্মান করা এবং কারও ওপর জোর না খাটানোর একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে, যাকে ‘গ্রেং জাই’ বলা হয়। মিনির মতে, এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই থাইল্যান্ডের নাগরিকরা পর্যটকদের খারাপ আচরণের মুখেও অনেক সময় নীরব থাকেন। তবে এখন দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাচ্ছে। মিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় থাইল্যান্ড এখন নিজেদের সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য সত্যিই চেষ্টা শুরু করেছে।’