রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের নতুন এক নাটকীয় অধ্যায়ের সাক্ষী হলো রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সেন্ট পিটার্সবার্গ। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্মশহর হিসেবে পরিচিত এই নগরীতে ইউক্রেনের ব্যাপক ড্রোন হামলার খবর প্রকাশিত হয়েছে। হামলার ফলে বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে, বেশ কয়েকজন আহত হন এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ তেল টার্মিনালে সফল দূরপাল্লার হামলা চালিয়েছে। ইউক্রেনের দাবি, হামলার লক্ষ্য ছিল কেবল সামরিক ও যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো। একই সঙ্গে ক্রনস্টাড নৌঘাঁটি ও তামবভ অঞ্চলের একটি অস্ত্র উৎপাদন কারখানাও আঘাতের শিকার হয়েছে। এসব স্থাপনা ইউক্রেন সীমান্ত থেকে কয়েক শ থেকে এক হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরে অবস্থিত।
রুশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লেনিনগ্রাদ অঞ্চলের আকাশে কয়েক ডজন ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে সব ড্রোন প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি। সেন্ট পিটার্সবার্গের গভর্নর স্বীকার করেছেন, হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন। যুদ্ধ শুরুর পর এই অঞ্চলে হতাহতের ঘটনা নিয়ে এটিই প্রথম আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিগুলোর একটি।
হামলার সময়টিও ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ঠিক এই সময়েই সেন্ট পিটার্সবার্গে শুরু হয়েছে বার্ষিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরাম, যাকে অনেকেই রাশিয়ার দাভোস বলে অভিহিত করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা এই সম্মেলনে অংশ নিতে এসেছেন। এর আগমুহূর্তে শহরে ড্রোন হামলা রাশিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
ড্রোন হামলার কারণে পুলকোভো বিমানবন্দরে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। একাধিক ফ্লাইট বিলম্বিত বা অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়। বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণে সাময়িক বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়। রুশ কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জরুরি ব্যবস্থা নেয়।
এই হামলা এমন এক সময় ঘটল, যখন মাত্র এক দিন আগে ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়া যুদ্ধের অন্যতম বৃহৎ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে শত শত ড্রোন ও ডজনখানেক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। কিয়েভ, দিনিপ্রো, খারকিভ, জাপোরিঝিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তত ২২ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়া ক্রমশ আরও বেশি ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ এখন সীমান্তবর্তী অঞ্চল ছাড়িয়ে উভয় দেশের গভীর অভ্যন্তরে পৌঁছে গেছে। একসময় ইউক্রেন কেবল আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে ছিল। কিন্তু এখন তারা দীর্ঘপাল্লার ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাশিয়ার তেল স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নিয়মিত আঘাত হানতে সক্ষম হচ্ছে। অন্যদিকে রাশিয়াও ইউক্রেনের শহরগুলোতে নজিরবিহীন বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
সেন্ট পিটার্সবার্গে হামলার মাধ্যমে ইউক্রেন স্পষ্টভাবে একটি বার্তা দিতে চেয়েছে—যুদ্ধক্ষেত্র শুধু ইউক্রেনের ভূখণ্ডেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামরিক কেন্দ্রগুলোও এখন হামলার আওতায় চলে এসেছে। আর এ কারণেই যুদ্ধের চতুর্থ বছরের এই পর্যায়ে এসে আকাশযুদ্ধই হয়ে উঠছে সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
সূত্র: সিএনএন, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, দ্য গার্ডিয়ান, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস, কিয়েভ ইন্ডিপেনডেন্ট