মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তেহরান দাবি করেছে, তাদের নতুন প্রজন্মের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এখন শুধু ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন ঠেকাতেই সক্ষম নয়, বরং আধুনিক যুদ্ধবিমানকেও চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই সামরিক অগ্রগতি সত্যিই কার্যকর প্রমাণিত হলে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশযুদ্ধের চিত্র বদলে যেতে পারে।
সম্প্রতি ইরানভিত্তিক বিভিন্ন গণমাধ্যম দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি মার্কিন নজরদারি ড্রোন ভূপাতিত করতে নতুন একটি দেশীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে। ‘আরাশ-এ কামানগির’ নামে পরিচিত এই প্রযুক্তিকে তেহরান নিজেদের সামরিক সক্ষমতার নতুন মাইলফলক হিসেবে তুলে ধরছে।
ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক মাস ধরে দেশটির সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর ওপর বিদেশি হামলার পরও তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অটুট রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য মনিটরের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চলতি বছর ইরানের আকাশসীমায় একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান এবং কয়েকটি ব্যয়বহুল নজরদারি ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার খবর সামনে আসার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যে কি বিদেশি শক্তির একচ্ছত্র আকাশ আধিপত্যের যুগ শেষ হতে চলেছে? তেহরান সেই বার্তাই দিতে চাইছে।
ইরানের সামরিক নেতৃত্ব কয়েক মাস ধরেই বলে আসছে, তারা নিজেদের আকাশসীমার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এপ্রিল মাসে দেশটির যৌথ সামরিক কমান্ড দাবি করেছিল, নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে একটি মার্কিন যুদ্ধবিমানকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এসব দাবির অনেকগুলোই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি, তবুও আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের নজর এখন তেহরানের দিকে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কৌশল এখন আর শুধু বড় ও ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা এমন মোবাইল ও তুলনামূলক কম খরচের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তৈরি করছে, যা দ্রুত স্থান পরিবর্তন করতে পারে এবং ড্রোন, যুদ্ধবিমান কিংবা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করতে সক্ষম। এর ফলে সম্ভাব্য হামলাকারীদের জন্য ঝুঁকি বাড়ছে।
এর আগে ইরান ‘বাভার-৩৭৩’, ‘আরমান’ এবং ‘আজারাখশ’ নামে একাধিক দেশীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্মোচন করেছিল। দেশটির দাবি, এসব প্রযুক্তি শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমান শনাক্ত করে ধ্বংস করতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাডার প্রযুক্তি, লক্ষ্য শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং দূরপাল্লার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও জোর দিয়েছে তেহরান।
তবে অনেক পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষক এখনো সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে সীমিত কয়েকটি সফলতার দাবি আর দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা এক বিষয় নয়। ইরানের নতুন প্রযুক্তি কতটা নির্ভরযোগ্য, তা বোঝার জন্য আরও সময় প্রয়োজন। কারণ আধুনিক আকাশযুদ্ধে শুধু ক্ষেপণাস্ত্র নয়, তথ্য সংগ্রহ, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, উপগ্রহ নজরদারি এবং সমন্বিত হামলা ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এদিকে চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে যে সংঘাত তৈরি হয়েছে, তা গোটা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা বলছে, ইরান একদিকে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করছে, অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনের কাছ থেকেও বিকল্প প্রযুক্তিগত সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে অঞ্চলজুড়ে সামরিক প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। এই অঞ্চলে ইরানের নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার খবর আন্তর্জাতিক বাজারেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ ভবিষ্যতে যদি আকাশ ও সমুদ্রপথে সামরিক উত্তেজনা বাড়ে, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যের ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরানের নতুন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সত্যিই ‘খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারবে’ কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, তেহরান তাদের সামরিক বার্তাটি বিশ্বকে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন আর আগের মতো একতরফা শক্তির প্রদর্শন হবে না, ইরান অন্তত সেই ধারণাই প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। ইরান এরমধ্যেই ক্ষেপনাস্ত্র হামলা করে সাফল্য দেখিয়েছে, এবার আকাশ প্রতিরক্ষার ক্যারিশমা দেখানোর অপেক্ষায়।
সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর, আল জাজিরা, রয়টার্স, মিডল ইস্ট আই, সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)