পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান আজও দাবি করে আসছেন, তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর দিন মস্কো সফর এবং পরে প্রকাশ্যে আসা একটি কূটনৈতিক বার্তাকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়। তবে ওয়াশিংটন বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক কর্তৃপক্ষের একাংশও বলেছে, ইমরানের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট ছিল পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের ফল।
ঘটনার শুরু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ঠিক যেদিন রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করে, সেদিনই মস্কোয় পৌঁছান ইমরান খান। সেখানে তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন। পশ্চিমাবিশ্ব যখন রাশিয়াকে একঘরে করার চেষ্টা করছে, তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ওয়াশিংটনের কাছে ভালোভাবে নেওয়া হয়নি বলে পরে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে আসে।
এর কিছুদিন পর ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের নিযুক্ত তৎকালীন রাষ্ট্রদূত আসাদ মজিদের পাঠানো একটি গোপন কূটনৈতিক বার্তা বা সাইফার সামনে আসে। ইমরান খান দাবি করেন, ওই বার্তায় মার্কিন কর্মকর্তা ডোনাল্ড লু পাকিস্তানকে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইমরান ক্ষমতায় থাকলে সম্পর্ক খারাপ হবে, আর তাকে সরানো গেলে সবকিছু ক্ষমা করে দেওয়া হবে। এই বক্তব্য পরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনায় আসে।
ইমরান খানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফের দাবি, এই বার্তাই প্রমাণ করে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সরকার সরাতে পাকিস্তানের শক্তিশালী মহলের ওপর চাপ দিয়েছিল। বিশেষ করে ইমরানের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টাকে ওয়াশিংটন ভালোভাবে নেয়নি বলে তাদের অভিযোগ।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযোগ একাধিকবার সরাসরি অস্বীকার করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী মন্ত্রী ডোনাল্ড লু কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, ইমরানের অভিযোগ পুরোপুরি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে এবং কোনো সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল না। পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদও এক বৈঠকে বলেছিল, বিদেশি ষড়যন্ত্রের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যদিও তারা স্বীকার করে, মার্কিন বার্তায় ‘কূটনৈতিক ভাষার বাইরে কঠোর সুর’ ছিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইমরান খানের পতনের পেছনে শুধু বিদেশি চাপ নয়, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার রাজনীতিও বড় কারণ ছিল। সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাওয়া, অর্থনৈতিক সংকট, বিরোধী জোটের ঐক্য ও সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো—সব মিলিয়েই তিনি অনাস্থা ভোটে হেরে যান। ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথমবার কোনো প্রধানমন্ত্রী অনাস্থা ভোটে ক্ষমতা হারান।
তবে বিতর্ক সেখানেই শেষ হয়নি। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ইমরান খান ‘আমদানি করা সরকার’ বলে নতুন সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালান। তিনি দাবি করেন, পাকিস্তানের রাজনীতিতে বিদেশি প্রভাব ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের হস্তক্ষেপ এখনো বাস্তবতা। তার সমর্থকদের বড় অংশও এই বক্তব্য বিশ্বাস করে।
পরবর্তীতে সাইফার মামলায় ইমরান খানকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ ছিল, তিনি গোপন রাষ্ট্রীয় নথি জনসমক্ষে এনে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ভঙ্গ করেছেন। যদিও পরে আপিল আদালত তাকে ওই মামলায় খালাস দেন, তবুও অন্যান্য মামলায় তিনি কারাগারেই থাকেন।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করেন, ইমরান খানকে ঘিরে পাকিস্তানে যে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন হয়েছে, তা দেশটির গণতন্ত্র নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। জাতিসংঘের একটি কর্মীদলও তার আটককে ‘আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন’ বলে মন্তব্য করেছিল।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আজ পর্যন্ত এমন কোনো প্রকাশ্য ও চূড়ান্ত প্রমাণ সামনে আসেনি, যা নিশ্চিতভাবে বলে, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য, রাশিয়া সফরের পরপরই তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ দ্রুত বেড়েছিল, আর সেই সাইফার বার্তা পাকিস্তানের রাজনীতিতে আজও সবচেয়ে বিতর্কিত নথিগুলোর একটি হয়ে আছে।
সূত্র: দ্য ইকোনোমিক টাইমস, রয়টার্স, আলজাজিরা, ইউরো নিউজ, ডেইলি পাকিস্তান